মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের শঙ্কা যখন গভীর হচ্ছে, ঠিক সেই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিকে সরাসরি আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী করলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তিনি সতর্ক করে বলেন, ওয়াশিংটনের চাপ ও সামরিক ভাষা শুধু ইরান নয়, গোটা অঞ্চলকেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে—যার পরিণতি কারও জন্যই শুভ হবে না।
মঙ্গলবারের এই ফোনালাপটি হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি দৃশ্যমানভাবে জোরদার করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেওয়ার পাশাপাশি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী অঞ্চলটিতে পাঠিয়েছেন। ওয়াশিংটনের ভাষ্য, ইরানের অভ্যন্তরীণ দমন–পীড়ন ও আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডের জবাব দিতেই এই প্রস্তুতি। তবে তেহরানের মতে, এসব হুমকি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে আগুন জ্বালানোর সামিল।
ইরানি প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, পেজেশকিয়ান সৌদি যুবরাজকে জানান যে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ ও সামরিক হুমকি ইরানের জনগণের মনোবল ভাঙতে পারেনি। বরং এসব পদক্ষেপ ইরানি সমাজকে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান দৃঢ় করেছে। তাঁর মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ভাঙার এই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবেই।
ফোনালাপে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সংলাপের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের প্রতি রিয়াদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, যুবরাজ ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে সংহতির ওপর জোর দিয়ে জানান, সৌদি আরব ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা উত্তেজনা বৃদ্ধির বিরোধী।
এরপর সৌদি সরকারি বার্তা সংস্থা এসপিএ আরও একধাপ এগিয়ে স্পষ্ট বার্তা দেয়—সৌদি আরব তার আকাশসীমা বা ভূখণ্ড কোনো অবস্থাতেই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ব্যবহার করতে দেবে না। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন, সৌদি আরব ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করে এবং যেকোনো বিরোধ শান্তিপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের পক্ষেই অবস্থান নেবে। এই বক্তব্যকে বিশ্লেষকরা তেহরানের প্রতি এক ধরনের কূটনৈতিক আশ্বাস হিসেবেই দেখছেন।
এই অবস্থানের জন্য সৌদি নেতৃত্বকে ধন্যবাদ জানান প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি যুবরাজের উদ্যোগ এবং অবস্থান ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান–সৌদি সম্পর্কের বরফ গলার প্রেক্ষাপটে এই ফোনালাপকে অনেকেই তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ক্রমেই আরও কড়া হয়ে উঠছে। আইওয়ায় দেওয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও ইরানের দিকে ‘বড় নৌবহর’ এগিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, তেহরানকে আগেই সমঝোতায় আসা উচিত ছিল। তাঁর এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা উসকে দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) থেকেও সতর্কবার্তা এসেছে। আইআরজিসির নৌবাহিনীর রাজনৈতিক উপপ্রধান মোহাম্মদ আকবরজাদেহ বলেন, ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো বন্ধু রাষ্ট্র। তবে তাদের ভূমি, আকাশ বা জলসীমা যদি ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটিকে শত্রুতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তাঁর ভাষায়, আঞ্চলিক নিরাপত্তাহীনতা সংক্রামক—এক জায়গায় আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এই উত্তেজনার পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক ইতিহাসও। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও পরমাণু বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালায়। পরে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এতে যুক্ত হয়ে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। মাত্র ১২ দিনের সেই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্র–ইরান পারমাণবিক আলোচনার ঠিক আগমুহূর্তে পুরো প্রক্রিয়াকে ভেস্তে দেয়।
এরপর থেকে ওয়াশিংটন ইরানের কাছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ ও পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে। যদিও আন্তর্জাতিক সংকট বিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক আলী ভায়েজের মতে, চাপের মুখে ইরান নতি স্বীকার করবে—এমন সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। তেহরানের নেতৃত্ব বিশ্বাস করে, চাপের কাছে মাথা নোয়ালে বরং আরও কঠোর চাপ নেমে আসবে।
সব মিলিয়ে, ইরান ও সৌদি আরবের এই ফোনালাপ মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িক কূটনৈতিক স্বস্তির ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবতা হলো—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি, প্রকাশ্য হুমকি এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধের স্মৃতি গোটা অঞ্চলকে এখনও এক ভয়ংকর অনিশ্চয়তার ভেতরেই আটকে রেখেছে। সূত্র : আল-জাজিরা








