সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন আসামি ফয়সাল আলী সাজি ও মোস্তাফিজুর রহমান। তারা জানিয়েছেন, শিমুল ভূঁইয়ার নির্দেশে হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করেন। হাড়-মাংস আলাদা করে টুকরো টুকরো করা ও মসলা মিশিয়ে মাংস বাইরে নেওয়া, কমোডে ফেলা এবং হাড়ের খণ্ডগুলো খালে ফেলার কাজ করেছেন তারা।
এই হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য তাদেরকে দলে নিয়েছিলেন শিমুল। চরমপন্থি দলের সদস্য ফয়সাল ও মোস্তাফিজকে পাসপোর্ট করে দেওয়া, ভারতে ভিসা করে দেওয়া, যাতায়াতের খরচ, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা সব করে দেন আকতারুজ্জামান শাহীন। ইতোমধ্যে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শাহীনের রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এল-ব্লকের বাসা থেকে ফয়সাল ও মোস্তাফিজের দুটি পাসপোর্ট উদ্ধার ও জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ এসব তথ্য দিয়েছে।
ফয়সাল ও মোস্তাফিজের বরাতে পুলিশ বলছে, কিলিং মিশন বাস্তবায়ন করে গত ১৯ মে কলকাতা থেকে দেশে আসার পর শাহীনের বাসায় ওঠেন তারা। এমপি আনার হত্যার আগে পাসপোর্ট ও ভিসা করার জন্য তারা প্রায় এক মাস বসুন্ধরার বাসায় ছিলেন। মোস্তাফিজের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তি ও এমপি আনার অপহরণ এবং হত্যা মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। গতকাল মঙ্গলবার আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন মোস্তাফিজ। ছয় দিনের রিমান্ড শেষে আজ বুধবার ফয়সাল আলী সাজিরও আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার কথা।
ফয়সাল ও মোস্তাফিজকে গত ২৬ জুন ফটিকছড়ি ও সীতাকুণ্ডের মাঝখানে খাগড়াছড়ি জেলার পাহাড়ি এলাকা পাতাল কালীমন্দির এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। পরদিন তাদেরকে ছয় দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। গতকাল ছিল রিমান্ডের শেষদিন।
ফয়সাল ও মোস্তাফিজের বরাতে পুলিশ জানিয়েছে, শাহীন দীর্ঘ পরিকল্পনার মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করেছেন। তিনি ঘটনাস্থলে থেকে হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিয়েছেন শিমুল ভূঁইয়াকে। আর শিমুল ভূঁইয়া দায়িত্ব দিয়েছেন ফয়সাল ও মোস্তাফিজকে। তাদের দুজনেরই বাড়ি খুলনার ফুলতায় শিমুলের বাড়ির কাছে। আদালতের নথিতে মোস্তাফিজের ঠিকানা লেখা হয়েছে বাবার নাম ইমান আলী, মায়ের নাম দোলেনা বেগম। গ্রাম যুগ্লীপাশা, থানা ফুলতলা।
ফয়সালেরও গ্রামের বাড়ি খুলনার ফুলতলা থানার অলকা গ্রামে। তার বাবার নাম আলাউদ্দিন সাজি ও মায়ের নাম জয়নব বেগম। দুটি পাসপোর্টের জন্য একই দিন আবেদন করা হয়। তারা একসঙ্গে ফিঙ্গার প্রিন্ট দেন এবং ছবি তোলেন। পাসপোর্টের ডেলিভারিও নেন একসঙ্গে। এ সময় তারা দুজনই শাহীনের বসুন্ধরার এল-ব্লকের ফ্ল্যাটে ছিলেন।
ডিবি কর্মকর্তারা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে ফয়সাল ও মোস্তাফিজ হত্যাকাণ্ডের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার সঙ্গে শিমুল ও তানভীরের বক্তব্যের মিল পাওয়া গেছে। তারা বলেছেন, শিমুলের নির্দেশে আনারকে হত্যার পর তার হাড়-মাংস আলাদা করা, মাংস ছোট ছোট টুকরো টুকরো করার দায়িত্ব ছিল ফয়সাল ও মোস্তাফিজের। আর জিহাদ ছিল তাদের সহযোগী।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি ওয়ারী বিভাগের সহকারী কমিশনার (এসি) মাহফুজুর রহমান জানান, ফয়সাল ও মোস্তাফিজের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শাহীনের বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসায় তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে অভিযান চালানো হয়েছে। এ সময় সেখান থেকে জারভর্তি বিপুল পরিমাণ মদ উদ্ধার করা হয়েছে। নির্মাণাধীন ভবনের দ্বিতীয় তলায় ওই মদের কারখানা ছিল।
ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, আনার হত্যার আগে ও পরে ওই বাসার যেসব রুমে ফয়সাল ও মোস্তাফিজ থাকতেন, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। এছাড়া তারা সঞ্জীবা গার্ডেনের ফ্ল্যাটে কিলিং বাস্তবায়নের সময় কার কী ভূমিকা ছিল, ওইসব বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানান, শাহীনের নির্দেশে ‘কাটআউট’ পদ্ধতিতে কিলিং মিশন বাস্তবায়ন করে শিমুল ভূঁইয়া। শাহীন যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দি বিনিময় চুক্তি না থাকায় শাহীনকে ডিবি ফেরত আনতে পারছে না। এই হত্যা মামলার নেপথ্যে আরও কারা আছে, সেটা জানার জন্য শাহীনকে জিজ্ঞাসাবাদ জরুরি। শাহীন অপহরণ, হত্যা ও লাশ গুম করা নিয়ে সবগুলোর সঙ্গে সরাসরি জড়িত। হত্যাকাণ্ডে জড়িত অনেক আসামি শনাক্ত ও গ্রেপ্তার হলেও মোটিভ অজানাই থেকে গেছে।
শাহীন বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, শাহীন যুক্তরাষ্ট্রে আছে। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বন্দি বিনিময় চুক্তি আছে, সেহেতু ভারতীয় পুলিশকে বলেছি যেন তাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। আমরা ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে গিয়ে কথা বলেছি। এছাড়া পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি শাখার মাধ্যমে আমরা ইন্টারপোলকে চিঠি দিয়েছি। শাহীনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য দুই দেশই কাজ করছে।
এমপি আনার ১২ মে ভারতে যান। পরদিন ১৩ মে কলকাতার নিউটাউন এলাকার সঞ্জীবা গার্ডেনের একটি ফ্ল্যাটে খুন হন তিনি। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে ২২ মে। ওইদিন রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় আনারের মেয়ে ডরিন অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেন। এছাড়া ভারতে একটি হত্যা মামলা হয়। দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে বাংলাদেশে সাতজন ও কলকাতায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তারা হলেন, চরমপন্থি নেতা শিমুল ভূঁইয়া ওরফে আমানুল্লাহ সাঈদ ওরফে শিহাব ওরফে ফজল মোহাম্মদ ভূঁইয়া, তার ভাতিজা তানভীর ভূঁইয়া, শাহীনের বান্ধবী সেলেস্তি রহমান, মোস্তাফিজুর রহমান, ফয়সাল সাজি, কাজী কামাল আহম্মেদ ওরফে গ্যাস বাবু ও ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাঈদুল করিম মিন্টু। এর মধ্যে শিমুল, তানভীর, সেলেস্তি ও গ্যাস বাবু আগেই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আর রিমান্ডের পঞ্চম দিন গতকাল মঙ্গলবার আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন মোস্তাজিুর রহমান। আজ রিমান্ড শেষে জবানবন্দি দেবেন ফয়সাল সাজি।
অপরদিকে কলকাতায় গ্রেপ্তার হয়েছে কসাই জিহাদ ও সিয়াম হোসেন। তাদের মধ্যে সিয়াম হত্যাকাণ্ডের পর নেপালে পালিয়ে যান। পরে বাংলাদেশ পুলিশের তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করে কাঠমান্ডু পুলিশ। পরে তাকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আনার হত্যা মামলার তদন্তে পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে গত ২৮ মে সঞ্জীবা গার্ডেনের সেফটিক ট্যাংকি ভেঙে চার কেজির মতো মাংসের টুকরো উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ। এছাড়া সিয়ামের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৯ জুন কলকাতার কৃষ্ণমাটি সেতু-সংলগ্ন এলাকার বাগজোলা খাল থেকে কিছু হাড় উদ্ধার করেছে কলকাতার সিআইডি পুলিশ। ওইসব মাংসের টুকরো ও হাড় সংসদ সদস্য আনারের বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন ডিএনএ টেস্ট। ডিএনএ নমুনা দেওয়ার জন্য কলকাতার সিআইডি এমপিকন্যা ডরিনকে যেতে বলেছে। এ বিষয়ে এমপি আনারের বড় ভাই এনামুল হক বলেন, ডরিন কিছুটা অসুস্থ থাকায় আমাদের যেতে বিলম্ব হয়েছে। ৫ অথবা ৬ তারিখ কলকাতায় যাওয়ার সম্ভাবনা আছে আমাদের।








