যুগে যুগে মানুষের সামনে নবীজি সম্প্রীতির যে শিক্ষা উপস্থাপন করেছেন, অমুসলিমদের সঙ্গে সহাবস্থানের যে বাস্তব দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন; উদারতা, সহিষ্ণুতা ও মানবতার যে আদর্শ স্থাপন করে গেছেন, পৃথিবীর আর কোনো ধর্ম বা মতাদর্শ এর ধারেকাছেও ভিড়তে পারেনি। তিনি ছিলেন রাহমাতুল্লিল আলামিন তথা সৃষ্টিকুলের করুণার আধার।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে তো তাঁর আদর্শ চরিত্রের স্বীকৃতি দিয়েছেনই, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে পৃথিবীর বিখ্যাত মনীষীরাও এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করানোর ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসুল (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরাম কোনো রকম জোর-জবরদস্তি করেননি। ইসলামের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই যুগে যুগে অমুসলিমরা ইসলামের পতাকাতলে আশ্রয় নিয়েছে।
ইসলামের আগে আরবের গোত্রগুলোর মধ্যে অনৈক্য, দ্বন্দ্ব, সংঘাত-সহিংসতা, শত্রুতা ও অসম্প্রীতি বিরাজ করছিল। অনৈতিক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকার কারণে পুরো আরব জাতি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এ অবস্থা থেকে ইসলামই রক্ষা করেছিল। আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে ঐক্য ও সম্প্রীতির ভূমিকা অনস্বীকার্য। জাতীয় ঐক্যের ওপর ইসলাম গুরুত্বারোপ করে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রশি (কুরআন) আঁকড়ে ধরো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না’ (সুরা আলে ইমরান : ১০৩)। এ আয়াতে ঐক্যের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বিভেদ সৃষ্টি করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। বর্তমানে মানুষ ঐক্য, সহমর্মিতা ও মানবিকতার বদলে নানা অনৈক্য, অপরাজনীতি চর্চায় লিপ্ত। মানুষের হিংস্রতা ও সহিংসতা দিন দিন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অকারণে একজন আরেকজনের জীবন-জীবিকা, সম্পদ ও ইজ্জত, সম্মানহানি করছে। যার কোনোটাই ইসলাম সমর্থন করে না। মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের কাজ। ঐক্য, সম্প্রীতি ও মানবপ্রেমের পথ মসৃণ করার কথা ইসলাম বারবার বলে। স্থিতিশীল পরিবেশ, পরামর্শ করে কাজ সম্পন্ন ও সামাজিক সমঝোতার মনোভাব ইসলামের শিক্ষা।
ইসলাম মুসলমানদের ঐক্যের ওপর সবসময় জোর তাগিদ দিয়েছে। কথায় আছে ‘একতাই বল’। বিচ্ছিন্ন থাকা বিপজ্জনক। পরিবারের সদস্যদের একতা পরিবারকে সুসংহত করে। সমাজের লোকদের একতা সমাজকে সুন্দর ও অপরাধমুক্ত করে। কর্মীদের একতা নেতাকে শক্তিশালী করে। দেশের জনগণের একতা দেশের কল্যাণ নিশ্চিত করে। গল্পে পড়েছিলাম, এক ব্যক্তি মৃত্যুর প্রাক্কালে নিজ ছেলেদের ঐক্যের গুরুত্ব বোঝাতে দশটি বাঁশের কঞ্চি একত্রিত করে আটি বেঁধে প্রত্যেক ছেলেকে দিলেন ভাঙতে। কিন্তু পৃথকভাবে প্রত্যেকে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করেও তা ভাঙতে পারল না। এরপর আটি খুলে একটি করে কঞ্চি প্রত্যেককে দিলে তারা সবাই এক মোচড়ে যার যার কঞ্চি ভেঙে ফেলল। এরপর পিতা ছেলেদের উদ্দেশ করে বললেন, তোমরা যদি ভাইয়ে ভাইয়ে ঐক্যবদ্ধ না থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও, তা হলে শত্রুরা তোমাদের এভাবেই ভেঙে ফেলবে ও পরাজিত করবে। আর যদি সব ভাই ঐক্যবদ্ধ থাকো, তা হলে কেউ তোমাদের কারও সামান্য ক্ষতি করতে পারবে না।
ইসলামের নির্দেশনা হলো, মুসলিম-অমুসলিম সবার সঙ্গেই শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। এমনকি কখনো যদি যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখনও প্রদর্শন করতে হবে ইসলামের নীতি ও নৈতিকতা। যুদ্ধাবস্থায়ও অমুসলিমদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা যাবে না। গির্জায় যারা ধর্মীয় উপাসনায় জীবন উৎসর্গ করেছে, তাদের ক্ষতি করা যাবে না। একজন মুসলমান রাষ্ট্রীয়ভাবে যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে তা অমুসলিমও পাবে। বিশ্বাস ও আদর্শের কারণে তাকে আঘাত করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রাখো, যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিক বা সংখ্যালঘুকে আঘাত করে বা তাকে অপদস্থ করে অথবা কর্মচারী নিয়োগ করে তার সাধ্যের বাইরে কাজ চাপিয়ে দেয়, আমি তার বিরুদ্ধে কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহর দরবারে মামলা করব (আবু দাউদ : ২/৪৩৩)। অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করবে, সে জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না; অথচ জান্নাতের সুগন্ধি চল্লিশ বছরের দূরত্বে অবস্থান করেও অনুভব করা যাবে।’ (বুখারি : ৬/২৫৩৩)
সমাজে মুসলিম-অমুসলিম সব ধরনের মানুষের বসবাস থাকে। অমুসলিমদের সঙ্গেও সামাজিক লেনদেন করা যাবে। অমুসলিমদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করা, তাদের কাছে জিনিসপত্র ভাড়া দেওয়া বা তাদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া ইত্যাদিতে ইসলামে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) কাফের-মুশরিকদের থেকে জিনিসপত্র কিনেছেন। আল্লাহর রাসুলের ইন্তেকালের সময়েও তাঁর একটি বর্ম একজন ইহুদির কাছে বন্ধক ছিল। ইহুদির কাছে বর্মটি বন্ধক রেখে তিনি তাঁর পরিবারের জন্য খাবার কিনেছিলেন। একজন মুসলিম অমুসলিমের কাছে দ্বীনি ও ধর্মীয় বিষয়াদি ছাড়া চিকিৎসা, শিল্প, কৃষি প্রভৃতি বৈজ্ঞানিক বিষয়াদিতে সহযোগিতা নিতে পারে। শাসন কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ মানুষ সবার জন্যই এই অনুমতি রয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে মুসলমানদের স্বনির্ভরতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে বিভিন্ন সময় অমুসলিমের কাছ থেকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সাহায্য নিয়েছেন।
হিজরত করার সময় পথ দেখানোর উদ্দেশ্যে তিনি মক্কার মুশরিক আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিতের সাহায্য নিয়েছিলেন। মুসলিম-অমুসলিমের মধ্যে উপহার বিনিময়ও হতে পারে। আল্লাহর রাসুল (সা.) অমুসলিম রাজা-বাদশাহর দেওয়া উপহার গ্রহণ করেছেন। ইসলামের সালাম বিনিময়ও সম্প্রীতির বন্ধন সুসংহত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি আহলে কিতাবদের (ইহুদি-খ্রিস্টান) কেউ সালামের মাধ্যমে তোমাদের অভিবাদন জানায় তা হলে বলো, ‘ওয়া আলাইকুম’ (বুখারি : ৫৯০১; মুসলিম : ২১৬৫)। ‘তবে ইহুদি কিংবা খ্রিস্টানদের প্রথমে তোমরা সালাম দেবে না।’ (মুসলিম : ২১৬৭)









