‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়ন সুপারিশ ও গণভোটের সময় নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে এখনও অনড় বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সমমনা দলগুলো। আদেশ জারি, গণভোটের সময়, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বসহ (পিআর) নোট অব ডিসেন্টের মতো বিষয়ে বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলোর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা দলগুলোর যে মতপার্থক্য, সেটি সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে সমাধান মেলেনি।
জামায়াতে ইসলামীসহ আট দল মঙ্গলবার সমাবেশ থেকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে সনদের আইনি ভিত্তি ছাড়া নির্বাচন হবে না। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান গণভোটে নোট অব ডিসেন্টের বিরোধিতা করে বলেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মতামতে জুলাই সনদ প্রণীত হয়েছে। যারা জুলাই বিপ্লব মানবে না, তাদের জন্য ২৬-এর নির্বাচন নেই। বিপ্লবের স্বীকৃতি দিতে হলে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দিতেই হবে। অন্যদিকে সংবিধানে নেই, যুক্তিতে বিএনপি সাংবিধানিক আদেশ জারির বিরুদ্ধে মত দিয়েছে। বিএনপি হুঁশিয়ার করেছেজুলাই সনদের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত সরকার দিলে তারা তা মানতে বাধ্য থাকবে না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সংবাদ সম্মেলনে দলটির ওই কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, জুলাই সনদের বাইরে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে সনদে স্বাক্ষরকারী কোনো দলের জন্য তা মান্য করার বাধ্যবাধকতা থাকবে না। সে ক্ষেত্রে সব দায়দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তাবে। নোট অব ডিসেন্ট যেভাবে রয়েছে, সেভাবেই সংস্কার করবে নির্বাচনে ম্যান্ডেট পাওয়া দল। নির্বাচনের দিনে গণভোট হতে হবে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার চেষ্টা করছে দুই পক্ষের মত, অবস্থান ও প্রত্যাশাকে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিতে।
সূত্র জানায়, বুধবার সচিবালয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, অর্থ উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকে সনদ বাস্তবায়নে কিছু প্রস্তাবনা উঠে আসে।
বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং গণভোটের সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ মেনে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫, নাকি অধ্যাদেশ জারি হবে বুধবার পর্যন্ত নিশ্চিত হয়নি। মঙ্গলবার আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়েছিলেন, তিন চার দিনের মধ্যেই জুলাই সনদ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির দাবি সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। বিএনপির দাবি অনুযায়ী, নির্বাচন ও গণভোট এক দিনে হতে পারে। জামায়াত ও এনসিপির দাবি অনুযায়ী, গণভোটে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকবে না। তবে বিএনপির দাবি পূরণ করতে আগামী সংসদের ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদকে’ নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দেওয়া হবে। জামায়াত, এনসিপিসহ অন্যান্য দলের দাবি পূরণে পিআর পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের বিধান থাকতে পারে। উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে বিষয়গুলো চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধানসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোটে চারটি প্রশ্ন রাখা হতে পারে। সংবিধানসংক্রান্ত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে যে ৩০টি প্রস্তাবে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বেশিরভাগ দল একমত সেগুলো নিয়ে গণভোটে একটি প্যাকেজ প্রশ্ন রাখা হতে পারে। সেখানে ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হবে এই ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়ন চান কি না। এর বাইরে ১৮টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে বড় ধরনের মতবিরোধ আছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব। এগুলো নিয়ে গণভোটে আলাদা তিন-চারটি প্রশ্ন করার চিন্তা হচ্ছে। পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসহ যেসব মৌলিক প্রস্তাবে বড় দল বিশেষ করে বিএনপির ভিন্নমত আছে, সেগুলো নিয়ে আলাদা কয়েকটি প্রশ্ন থাকবে।
৩০টি দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ৬টি সংস্কার কমিশনের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে তৈরি করা হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ। ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধানসম্পর্কিত। এর মধ্যে অন্তত ৩০টি প্রস্তাবে কোনো না কোনো দলের ভিন্নমত আছে। সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে ভিন্নমতের বিষয়টি রাখা হয়নি। সংবিধানসংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাব খসড়া আদেশের তফসিলে রাখা হয়েছে। একটি আদেশ জারি করে গণভোট করার সুপারিশ ছিল ঐকমত্য কমিশনের। সেখানে একটিই প্রশ্ন রাখার সুপারিশ ছিল। সেটি হলো, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুমোদন করেন কি না এবং এর তফসিলে থাকা সংস্কার প্রস্তাবগুলো সমর্থন করেন কি না। গণভোটের সময় নিয়ে সিদ্ধান্তের ভার সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।







