শ্বাসরুদ্ধকর দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচে পাকিস্তানকে হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ পকেটে পুরেছে বাংলাদেশ। নিজেদের বোলারদের বিধ্বংসী বোলিং এবং জাকের আলীর লড়াকু ফিফটি টাইগারদের এই ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ে মূল ভূমিকা রেখেছে। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে পাকিস্তানের বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের প্রথম সিরিজ জয়।
পাকিস্তানকে ৮ রানে হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখে টি-টোয়েন্টি সিরিজ নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। ১২৫ রানে পাকিস্তানকে অলআউট করেছে বাংলাদেশ।
টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। দ্বিতীয় ওভারেই নাঈম শেখ (৩) ফাহিম আশরাফের শিকার হন। এরপর অধিনায়ক লিটন দাস (৮) এবং আগের ম্যাচের নায়ক তাওহীদ হৃদয় (০) দ্রুত প্যাভিলিয়নে ফেরেন, হৃদয়ের বিদায় হয় সালমান আঘার সরাসরি থ্রোয়ে। পারভেজ হোসেন ইমন (১৩) সহজ ক্যাচ দিলে পাওয়ার প্লের মধ্যেই ২৮ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে মহাবিপদে পড়ে বাংলাদেশ।
এই চরম সংকটময় মুহূর্তে দলের হাল ধরেন মেহেদী হাসান এবং জাকের আলী। মেহেদী ২৫ বলে ২ চার ও ২ ছক্কায় ঝোড়ো ৩৩ রান করে ইনিংসের গতি বাড়ান। অন্যদিকে, জাকের আলী অসাধারণ ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস দেখিয়ে ৪৭ বলে ১ চার ও ৫ ছক্কায় ৫৫ রানের এক অনবদ্য ইনিংস খেলেন, যা তার ক্যারিয়ারের তৃতীয় ফিফটি। জাকের ও মেহেদী পঞ্চম উইকেটে ৫৩ রানের জুটি গড়ে দলকে ৮১ রানে নিয়ে যান। মেহেদী ৩৩ রানে আউট হওয়ার পর রিশাদ হোসেন (৮) একটি ছক্কা হাঁকালেও পরের বলেই বোল্ড হন। শামীম পাটোয়ারী (১) এবং তানজিম হাসান সাকিব (৭) দ্রুত বিদায় নেন। শেষ পর্যন্ত, জাকের আলীর বীরোচিত ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ সবকটি উইকেট হারিয়ে ১৩৩ রানের সম্মানজনক স্কোর গড়ে।
পাকিস্তানের বোলাররা এই ম্যাচে কৌশল পরিবর্তন করে ধীর গতির বলের ব্যবহার বাড়ান, যা বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয়। পাকিস্তানের হয়ে সালমান মির্জা, আহমেদ দানিয়েল এবং আব্বাস আফ্রিদি— প্রত্যেকেই দুটি করে উইকেট শিকার করে বাংলাদেশের রান আটকে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অভিষেক টি-টোয়েন্টিতে আহমেদ দানিয়েল নিজের পঞ্চম বলেই পারভেজ হোসেন ইমনকে আউট করে প্রথম উইকেট লাভ করেন।
পাকিস্তানের ব্যাটিং: টাইগার বোলারদের বিধ্বংসী পারফরম্যান্স
১৩৪ রানের সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তানের শুরুটা ছিল আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশের পেস ও স্পিনের সম্মিলিত আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে তারা।
প্রথম ওভারেই সাফল্য: মাহেদী হাসানের করা প্রথম ওভারের শেষ বলে রান আউট হন সাইম আইয়ুব (১)। রিশাদের দ্রুত ফিল্ডিং এবং লিটনের ক্ষিপ্রতায় পাকিস্তান প্রথম ওভারেই উইকেট হারায়।
শরিফুলের জোড়া আঘাত: দ্বিতীয় ওভারে শরিফুল ইসলাম পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। তার বলে এলবিডব্লিউ হয়ে গোল্ডেন ডাক মারেন মোহাম্মদ হারিস (০)। এরপর ফখর জামানকে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ার আগেই হাসান নওয়াজ (৬) তার বলে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। ফলে ৯ রানেই ২ উইকেট হারায় পাকিস্তান।
তানজিমের জোড়া আঘাত: পঞ্চম ওভারে আক্রমণে এসে তানজিম হাসান সাকিব পরপর দুটি উইকেট নেন। তার তৃতীয় বলে হাসান নওয়াজ (০) লিটন দাসের হাতে ক্যাচ দেন এবং পরের বলে মোহাম্মদ নওয়াজ (০) একইভাবে উইকেট হারান। ১৫ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে পাকিস্তান তখন দিশেহারা। তানজিমের হ্যাটট্রিক আটকে দেন খুশদিল শাহ।
পাওয়ার প্লেতে অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণ: পাওয়ার প্লেতে ৫ উইকেট নিয়ে পাকিস্তানকে মাত্র ১৭ রান দেয় বাংলাদেশ। শরিফুল ইসলাম ও তানজিম হাসান সাকিব দুটি করে উইকেট নেন।
মেহেদীর জাদু: ১৫ রানে ৫ উইকেট হারানোর পর খুশদিল শাহকে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন ফখর জামান (৯)। তবে দশম ওভারে মেহেদী হাসান ফখরকে লং অনে তাওহীদ হৃদয়ের ক্যাচ বানান। ৩০ রানে ষষ্ঠ উইকেট হারায় পাকিস্তান। নিজের শেষ ওভারে মেহেদী হাসান তার দ্বিতীয় উইকেট তুলে নেন। ১২তম ওভারের পঞ্চম বলে খুশদিল শাহকে (১৩) এলবিডব্লিউ করেন বাংলাদেশের এই স্পিনার। ৪৭ রানে পাকিস্তান সপ্তম উইকেট হারায়।
এরপর বাকি উইকেটগুলোও দ্রুত পতন হলে ১২৫ রানেই গুটিয়ে যায় পাকিস্তানের ইনিংস।
সিরিজ জয় ও আত্মবিশ্বাসী টাইগাররা
সিরিজের প্রথম ম্যাচে দাপুটে জয়ের পর বাংলাদেশ দল আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে ছিল এবং এই ম্যাচেও তার প্রমাণ দিল। বোলার তাসকিন আহমেদ, তানজিম হাসান এবং মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানের পিচ বুঝতে না পারার সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছিলেন। কিছু ক্যাচ হাতছাড়া হলেও, তাদের সুশৃঙ্খল বোলিং পাকিস্তানকে মাত্র ১১০ রানে আটকে রাখে এবং বাংলাদেশ ৭ উইকেট ও ২৭ বল হাতে রেখে সহজেই জয় পায়।
দুই দলের একাদশ:
বাংলাদেশ একাদশ: পারভেজ হোসেন ইমন, নাঈম শেখ, লিটন দাস (অধিনায়ক ও উইকেটরক্ষক), তাওহীদ হৃদয়, শামীম হোসেন, জাকের আলী, মেহেদী হাসান, রিশাদ হোসেন, তানজিম হাসান, শরিফুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান।
পাকিস্তান একাদশ: ফখর জামান, সাইম আইয়ুব, মোহাম্মদ হারিস (উইকেটরক্ষক), হাসান নওয়াজ, সালমান আঘা (অধিনায়ক), মোহাম্মদ নওয়াজ, খুশদিল শাহ, ফাহিম আশরাফ, আব্বাস আফ্রিদি, সালমান মির্জা, আহমেদ দানিয়াল।








