মে দিবস শ্রমজীবী মানুষদের নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রামের এক রক্তাক্ত ফসল। কিন্তু এই ফসল আবাদ কী শ্রমিকরা ভোগ করতে পারছে? এই প্রশ্নটির সাথে আরো বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন সামনে চলে আসে শ্রমিক দিবস নিয়ে লিখতে গেলেই।
শোষণ, বঞ্চনা, অবজ্ঞা, উপেক্ষা, মজুরী বৈষম্য, অমানবিক নির্যাতন ও হাড়ভাঙা পরিশ্রম থেকে কি আদৌ তাদের মুক্তি মিলেছে? বেড়েছে কি তাদের জীবনের মান? যথার্থ অর্থেই পূরণ হয়েছে কি তাদের অভাব, অভিযোগ ও মৌলিক মানবিক চাহিদা? দূর হয়েছে কি তাদের দুঃখ, যন্ত্রণা ও দারিদ্রতা? নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত করা গেছে কি তাদের কর্মস্থল ও কর্মজীবন?
কালের ব্যবধান যদিও ভিন্ন। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষদের অভিন্ন সেই দাবিগুলি আজও অপূরণই থেকে গেছে। শাসক, প্রশাসক ও মালিকশ্রেণি কেউই শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ও অধিকার সুরক্ষায় আজও আন্তরিক হতে পারেনি।
পহেলা মে, মহান মে দিবস বা শ্রমিক দিবস।
শোষণের বিরুদ্ধে শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ে ঐতিহাসিক সংগ্রামের দিনটাই হচ্ছে মহান মে দিবস। পৃথিবীর সব দেশে যথাযথ মর্যাদার সাথে ঐতিহাসিক মহান মে দিবস পালন করবে দুনিয়ার সকল মজদুর মানুষ। যাদের রক্ত ও ঘামের বিনিময়ে আজকের আধুনিক বিশ্বের এ যান্ত্রিক বিশ্বায়ন সেই যান্ত্রিক বিশ্বায়নের নির্মাতা দুনিয়ার সব শ্রমজীবী মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর দিন এই পয়লা মে।
জুলুমের বিরুদ্ধে মজলুমের জয় হবেই একদিন না একদিন এমন বিশ্বাসেই ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও লড়াই কর’ শ্লোগানটি মে দিবসে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। লড়াইয়ের শুরুটা হয়েছিল ১৮৮৬ সালে পহেলা মে। এই দিন আমেরিকার শিকাগো শহরে হে মার্কেটে। মানবের প্রতি দানবীয় শ্রমঘন্টার বিরুদ্ধে ৮ ঘন্টা কাজের দাবিতে সেই দিন লক্ষ-লক্ষ মানুষ ন্যায্য অধিকার আদায়ে সমবেত হয়েছিল শিকাগোর হে মার্কেটে। ১লা মে’র শিকাগো ধর্মঘট শেষ পর্যন্ত রক্ত সংগ্রামে পরিণত হয়। পহেলা মে ধর্মঘট এক পর্যায়ে অবস্থান কর্মসূচিতে পরিণত হয়। অব্যাহত ধর্মঘট চলাকালে ৩ মে রাজপথের বিক্ষোভ মিছিলে শাসক গোষ্ঠির পুলিশি অভিযানে প্রাণ হারান ৫ জন কর্মবীর শ্রমিক। নিরস্ত্র শ্রমজীবী মানুষের উপর অস্ত্রধারী পুলিশের হামলার প্রতিবাদে বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠে। পরে ১৮৯০ সালে গ্রেট ব্রিটেনের হাইড পার্কে লাখো শ্রমিকের সমাবেশে মে দিবস পালন করা হয়। এর আগে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে ২য় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আন্তর্জাতিকভাবে ১লা মে মহান মে দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ধীরে-ধীরে ১লা মে শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সংহতির প্রতীক হিসেবে মহান মে দিবস পৃথিবীর দেশে-দেশে যথাযোগ্য মর্যাদা লাভ করে, সেই থেকে মহান মে দিবস পালন করা হচ্ছে।
দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে মহামতি লেনিন ১৯০৪ সালে এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, ‘‘শ্রমিক বন্ধুগণ! মে দিবস আসছে, সকল দেশের শ্রমজীবী মানুষ ইহা পালন করবেন, তাদের জেগে ওঠার ও আত্মসচেতন জীবন গড়ার প্রত্যয়ে, তারা একাত্মতা ঘোষণা করবেন সেই সংগ্রামের প্রতি যা অনাহার, দারিদ্রতা, অপমান, নির্যাতন, নিপীড়নসহ সকল প্রকার জবরদস্তির অবসান ঘটাবে। সমাপ্ত হবে মানুষ কর্তৃক মানুষ শোষণের সকল প্রকার ব্যবস্থার। দুইটি বিশ্ব পরস্পর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে; মহান লড়াইয়ের জন্য। পুঁজিবাদ বিশ্ব ও শ্রমিক শ্রেণির বিশ্ব, শোষক শ্রেণির ও দাসত্বের বিশ্ব এবং ভ্রাতৃত্বের ও স্বাধীনতার বিশ্ব।’’
বাংলাদেশের শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিণতি প্রায় একই রকম। রাষ্ট্রীয় শাসক এবং পুঁজিপতিদের চরিত্র আজও বদলায়নি এই দেশে। বদলায়নি তাদের শোষণের ধরণ ও নির্যাতনের ধারা। মজুরি, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাসিক বা বাৎসরিক ছুটি সব ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা এখনও নিম্নতম পর্যায়ে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ছয় বছর উপলক্ষে ‘তৈরি পোশাক খাতে সুশাসন: অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরে কয়েকবছর আগে টিআইবি বলেছে, তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের নতুন মূল মজুরি কাঠামোতে শ্রমিকদের আয় গড়ে ২৬ শতাংশ কমেছে।
‘‘ষাট, সত্তর এবং আশির দশকে পাট ও টেক্সটাইল কারখানাভিত্তিক শ্রমিক আন্দোলন ও ট্রেউ ইউনিয়নের ধারা ছিল ইতিবাচক৷ তখন মালিকপক্ষও এর তেমন বিরোধী ছিল না৷ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ব্যাংক ও সেবাখাতের ট্রেড ইউনিয়ন বা সিবিএ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়৷ কিন্তু আশির দশকে যখন তৈরি পোশাক কারখানার বিকাশ ঘটতে শুরু করে, তখন থেকেই এই খাতে ট্রেড ইউনিয়নবিরোধী মনোভাব ছিল প্রবল৷ হয়ত শতভাগ রপ্তানিমুখী হওয়া একটা কারণ হতে পারে৷ কিন্তু মালিকদের মনোভাব এতই নেতিবাচক হয় যে, যাঁরা পোশাক কারখানায় ট্রেড ইউনিয়নের উদ্যোগ নেয়, তাঁদের ছাঁটাই করে, মামলা দেয় এবং নির্যাতন করে৷”
বাংলাদেশে কোনো কালেই শ্রমিক আন্দোলন সফলতা পায়নি।সঙ্গত কারনে এদেশে স্বাধীনতা উত্তর শ্রমিক বান্ধব কোনো আইন প্রনয়নও সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
দেশের শ্রমিকরা এখনও আগুনে পুড়ে বা পদদলিত হয়ে এবং ভবন ধসে মরে। আহত হয়ে বরণ করে পঙ্গুত্ব। কেউ কেউ হারায় মানসিক ভারসাম্যহীনতা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকরা এখনও বেতন বৈষম্যের শিকার। কর্মস্থলে যৌন হয়রানিসহ তারা নানান ধরনের নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে তারা তাদের শ্রমের কোন আর্থিক মূল্যও পায় না। বিশেষ করে কৃষিখাতে।
এর প্রকৃত কারন হিসেবে রাজনৈতিক শ্রমিক সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক প্রভাবকেই চিহ্নিত করা যায়।
শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ কোনো না কোনো দলের হয়ে কাজ করে,ফলে ব্যক্তি স্বার্থে জড়িয়ে শ্রমিক স্বার্থ নিয়ে ভাববার অবকাশ নেই তাদের।
এদেশে শ্রমিক আন্দোলন কখনো উজ্জ্বল আবার কখনো নেতিবাচক চরিত্র নিয়ে এগিয়েছে৷ পোশাক খাতে শ্রমিক আন্দোলনের যেমন বড় ভূমিকা আছে, তেমনি ব্যাংক ও সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে সিবিএকে ক্ষমতা, বিত্তের উৎস মনে করা হয়৷
বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের এখন শ্রমিক শাখা রয়েছে৷ ওই দলগুলোর নামে কেন্দ্রীয় থেকে শুরু করে ইউনিট পর্যন্ত শ্রমিক সংগঠনের শাখা রয়েছে৷ শ্রমিক নেতারা এখন মন্ত্রী হন, অতীতেও হয়েছেন৷ পাটকলগুলোর শ্রমিক সংগঠন এক সময় খুব প্রভাবশালী ছিল৷ তাদের নেতারা জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতেন৷ এখন সেই জায়গা নিয়েছে পরিবহণ শ্রমিকদের সংগঠন৷ নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান একই সঙ্গে মন্ত্রী এবং পরিবহণ শ্রমিকদের শীর্ষ নেতা৷ তাঁর প্রভাবের কারণে সড়ক পরিবহণ নিয়ে জনবান্ধব আইন করা যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে৷
এরকম অহরহ উদাহরণ রয়েছে যা শ্রমিক বান্ধব আইন প্রণয়নের অন্তরায়।
একবিংশ শতাব্দী এই সময়ে দাঁড়িয়ে এখনো আমাদের শ্রমিক নির্যাতনের খবর শুনতে হয় যা আমাদের নীতি নির্ধারক মহলের জন্য লজ্জাজনক।
এখনো দেখতে হয় চার মাসের বকেয়া বেতন আদায়ের আন্দোলনে শ্রমিকদের ধর্মঘট,এখনো কৃষকদের পাকা ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে রাস্তায় ফেলে দেওয়ার দৃশ্য দেখতে হয়!এখনো পুঁজিবাদীমহলের শোষণ ও বঞ্চণার শিকার হতে হয় শ্রমিকশ্রেণী নিম্নবিত্তদের।সভ্যতার মুখোশে এখনো আমরা অসভ্যতা বয়ে বেড়াচ্ছি।
শ্রমের মর্যাদা ও শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও ) এবং দেশের শ্রম আইন সংবিধান অনুসারে শ্রমিক শ্রেণীর মানুষের ন্যায্য অধিকার সংরক্ষিত আছে। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার যেন কিতাবে আছে গোয়ালে নেই। বরাবরই এই দেশের দিনমজুর শ্রেণীর মেহনতি মানুষ বঞ্চিত ও শোষিত। শুধু গার্মেন্টস শিল্পে নয় ওয়ার্কসপ বিভিন্ন মিল, ফ্যাক্টরি ও ব্রিকফিল্ড শ্রমিকের পর সবচেয়ে বেশি শোষণের শিকার হয় ঘরের গৃহকর্মীরা। গায়ে কেরোসিন ঢেলে গরম ইস্ত্রির সেকা দিয়ে পেট-পিঠ ঝলসে দেওয়া ঘটনা অহরহ। শুধু তাই নয় গৃহ কর্মীদের উপর বর্বর নির্যাতনের পাশাপাশি খুন ধর্ষণও করা হচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় যে গৃহকর্মী নির্যাতনে পুরুষের চেয়ে নারীরাই বেশি এগিয়ে। নারী হয়ে নারীর উপর বর্বরতা নষ্ট সমাজের নিদর্শন।
বাংলাদেশে শুধুমাত্র কয়েকটি সেক্টরের শ্রমিক সংগঠনের নিদর্শন থাকলেও অধিকাংশ সেক্টরে শ্রমিক ইউনিয়ন নেই।ফলে এদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনও নির্জীব।
প্রতিবছর ১লা মে বা মে দিবস আসলেও,আসে না এদেশের শ্রমিকদের ভাগ্যোন্নয়ন।সময় বদলে যায়,কালের স্রোতে বদলে যায় অনেক কিছু,তবু বদলে যায় শ্রমজীবি মানুষের ভাগ্য।
সরকারের বিভিন্ন স্তরে সুবিধাবাদীদের পদচারণায় শ্রম আইন বাস্তবায়নে এক অশুভ শক্তি অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
মে দিবস যদিও শ্রমিকদের একটি পবিত্র দিন। কিন্তু তা ভক্তিবাদের নয়, প্রতিবাদের। এই একটি দিনেই একাট্টা হয় শ্রমজীবী শ্রেণি। তবে দিবসটি আনুষ্ঠানিকতার ভারে এখন এতটাই জর্জরিত যে, এর মধ্যদিয়ে এখন আর শ্রেণিচেতনার বিদ্যুৎ বেরিয়ে আসতে দেখা যায় না। এই দিবসটি এখন আর সাহায্য করে না শ্রেণি সংগ্রামের আগুন জ্বালাতে। আজও পারেনি সমাজ পরিবর্তনের সেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে। তাই মে দিবস ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এই দিনের আবেদন এবং গুরুত্ব মেহনতি ও শ্রমজীবী মানুষের কাছে কেবল মানই নয় যেন এক মৃত দিবসের শোকার্ত অনুষ্ঠান।
যেন স্মৃতি চারণ ও শ্লোগানে মুখরিত হবার দিন।নিছক একটা ছুটির দিন,ঘরে বসে আমরা শ্রমিক,১লা মে আমাদের দিবস বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার দিন।
লেখক: কবি ও কলামিষ্ট
নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক কলিকাল
ই-মেইল:smlalon1992@gmail.com














