ভোটের রাজনীতিতে নানা সমীকরণের কারণে এখন পর্যন্ত জোটের আসনগুলো ঝুলিয়ে রেখেছে বিএনপি।
৬৪টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা না করলেও যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা কে কোন আসনে নির্বাচন করবেন তা এখনও জানা যায়নি। মিত্র কাউকেই চূড়ান্ত করেনি বিএনপি। এতে হতাশ শরিক নেতারা।
কয়েকজন পরিচিত নেতাকে আসন রদবদল ও জাতীয় সরকারে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে বিএনপির তরফ থেকে। বিএনপি চলতি সপ্তাহেই জোটের আসনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে বলে জানা গেছে।
৩ নভেম্বর ২৩৭ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা ঘোষণা করেছে বিএনপি। এর এক দিন পর মাদারীপুর-১ আসন স্থগিত করা হয়। এই ঘোষণার পর থেকেই বিএনপি প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিপরীতে জোট শরিকরা আছেন শঙ্কায়। তাদের আসন এখনও চূড়ান্ত না হওয়ায় অসন্তোষ আছে অনেকের মধ্যে। এমন পরিস্থিতিতে বুধবার থেকে মিত্র রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক শুরু করেছে বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটি। ধারাবাহিক বৈঠকের প্রথম দিন রাতে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সঙ্গে বৈঠক হয়। বৃহস্পতিবার ১২ দলীয় জোটের সঙ্গে বৈঠকের কথা থাকলেও তা হয়নি।
জাতীয় দলের চেয়ারম্যান ও ১২ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা সময়ের আলোকে বলেন, আমরা এখনও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছি না যে বিএনপি আমাদের আসন ছাড় দিচ্ছে। আমাদের সঙ্গে বৃহস্পতিবার বিএনপির বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্থায়ী কমিটি জরুরি সভা ডাকায় তা স্থগিত করা হয়েছে। হয়তো শিগগিরই আনুষ্ঠানিক আলোচনা হবে।
জানা গেছে, ১২ দল থেকে তিনজনকে বিএনপি ছাড় দেবে। তারা হলেন- পিরোজপুর থেকে জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান ও জোটের প্রধান মোস্তফা জামাল হায়দার, লক্ষ্মীপুর থেকে এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম ও কিশোরগঞ্জ থেকে জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা।
কুষ্টিয়ার একটি আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন সাবেক এমপি আহসান হাবিব লিঙ্কন। বিএনপি তার আসনে ইতিমধ্যে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের নেতা ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ সময়ের আলোকে বলেন, আমরা লিয়াজোঁ কমিটির নেতা নজরুল ইসলাম খানের সঙ্গে বৈঠক করেছি। আমার একটি আসন কনফার্ম আছে। দুয়েক দিনের মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে চূড়ান্ত বৈঠক হবে।
গণতন্ত্র মঞ্চের একজন নেতা সময়ের আলোকে জানান, তাদের শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-১২ আসন দিতে পারে। যদিও বিএনপি এই আসনে সাইফুল আলম নীরবকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। গণতন্ত্র মঞ্চ থেকে একজন নেতাকে উচ্চ কক্ষে নিয়ে মন্ত্রী বানাতে পারে; এমন আলোচনাও রয়েছে। নাগরিক ঐক্য থেকে একটি আসন সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাই পাবেন।
এ বিষয়ে সাইফুল হক সময়ের আলোকে বলেন, আমি এখন পর্যন্ত ঢাকা-৮ আসনে গণসংযোগ করছি। তবে আলোচনা আছে ঢাকা-১২ নিয়ে। আমি এই আসনের ভোটার। ত্রিশ বছর ধরে এই আসনে থাকি। হয়তো এখানে অ্যাডজাস্টমেন্ট হতে পারে। তবে আমরা এই সপ্তাহে বিএনপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসব। সেখানে আসনের বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে।
২০১৮ সালের নির্বাচনে ঢাকা-১৮ থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন। এবার তার প্রত্যাশিত আসন ফেনী-৩ থেকে হেভিওয়েট নেতা আব্দুল আউয়াল মিন্টুকে প্রার্থী করেছে বিএনপি। অনেকটা হতাশ কণ্ঠে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, আমি এতদিন কাজ করলাম এই আসনে। এখন বিএনপি সেখানে প্রার্থী দিয়েছে। জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রবের স্ত্রী তানিয়া রবের জন্য লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসন ফাঁকা রেখেছে বিএনপি। যদিও সেখানে বিএনপির সাবেক এমপি আশরাফ উদ্দিন নিজান নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। জোটের কাউকে প্রার্থী হতে দেবেন না বলে তিনি হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত কী হবে জানি না। ধোঁয়াশায় আছি।
গণসংহতি আন্দোলন-জিএসএর প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি সময়ের আলোকে বলেন, আমার আসন নিশ্চিত হলেও অন্যদের বিষয়ের এখনও কোনো অগ্রগতি নেই। যুগপৎ আন্দোলনের শরিক একজন নেতা সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপির আসন কিন্তু হাতের মোয়া নয়। আমরা চাইলেই বিএনপি আসন দিয়ে দেবে, ব্যাপারটা এত সহজ না। অযথা আসন দিয়ে কী হবে যদি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে হেরে যায়। এ ছাড়া এবার ভোট করতে হবে নিজস্ব প্রতীকে। ধানের শীষ ছাড়া মাঠে লড়াই করা কঠিন। আমাদের কাছে চেয়েছে আমরা আসনের তালিকা দিয়েছি। এটা ফরমালিটিজ মাত্র। বিএনপি মাঠ জরিপ করেই তা চূড়ান্ত করবে।
আসন পাবেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর পটুয়াখালী ও সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান ঝিনাইদহ থেকে। আর গণফোরামের নেতা সুব্রত চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, আমি তো ঢাকা-৬ আসন থেকে ২০১৮ সালে নির্বাচন করেছি। এবারও সেখানে চাই। যদিও বিএনপি ঢাকা-৭ আসন ফাঁকা রেখেছে।
যুগপৎ আন্দোলনের শরিক লেবার পার্টির চেয়াম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান সময়ের আলোকে বলেন, আমরা ধারণা করছি বিএনপি আমাদের দুটি আসনে ছাড় দেবে। একটি ঝালকাঠি ও আরেকটি ফরিদপুর। এই দুই জায়গায় আসন ফাঁকা রেখেছে বিএনপি। আমরা বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। মনে হচ্ছে বিএনপি জোটের আসনগুলো ঝুলিয়ে রেখেছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান সময়ের আলোকে বলেন, এবার জোটকে এত আসন দেওয়া হবে না যতটা ২০১৮ সালে দেওয়া হয়েছিল। ৩০-৪০টির বেশি আসন হয়তো দেওয়া হতে পারে। কারণ এবার জামায়াতে ইসলামী আলাদা নির্বাচন করছে। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সময়ের আলোকে বলেন, আমরা জোটের আসন এখনও চূড়ান্ত করিনি। সব দলকে হয়তো আমরা পর্যাপ্ত আসন দিতে পারব না। তবে কিছু দেওয়া হবে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিষয়টি নিয়ে আরও পর্যালোচনা করছেন। তিনি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা করে চূড়ান্ত নেবেন।








