রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৫ মাঘ ১৪৩২, ১৯ শাবান ১৪৪৭, শীতকাল

‘মাদকের ভয়াবহতা বিস্তাররোধে প্রয়োজন সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ’

বর্তমান সময়ে মিডিয়া তথা পত্র-পত্রিকার দিকে তাকালেই আঁতকে উঠি– কোনদিকে যাচ্ছি আমরা? চারদিক মাদকে সয়লাব।

সম্প্রতি পিতা কর্তৃক মাদকাসক্ত ছেলেকে হত্যা আবারো নাড়া দিয়েছে পুরো সমাজকে।
এমনি করে বেশ কয়েক বছর আগে ঐশীর ঘটনাটি আমাদের ভীত নাড়িয়ে দিয়েছিলো। মাদকাসক্ত ঐশী নিজ হাতে বাবা মা কে হত্যা করে আতঙ্কিত করে দিয়েছিলো গোটা দুনিয়াকে। বিবেক বিধ্বস্ত হয়েছিলো আমাদের। মাদকাসক্তির কুফল কতটা ভয়াবহ তা এধরনের ঘটনা থেকেই উপলব্দি করতে পারি আমরা।

মাদকাসক্তির তথ্য ঘাঁটতে গিয়ে থমকে যাই। মোট জনসংখ্যার ৫% মানুষ বিভিন্ন প্রকার ড্রাগে আসক্ত। আমেরিকাতে প্রতি তিন জন মাদকাসক্ত পুরুষে একজন মহিলা অবৈধ মাদকে আসক্ত যা ইন্ডিয়া বা ইন্দোনেশিয়া তে প্রতি দশ জন পুরুষে একজন। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী মাদকাসক্তির কারনে প্রতি বছর দু’লাখ মানুষ মারা যায়।
বাংলাদেশেও মাদকাসক্তের সংখ্যা ভয়ঙ্কর হারে বাড়ছে। এক জরিপে জানা গেছে, এই সংখ্যা ৭০ লাখেরও বেশি। জরিপে সঠিক সংখ্যা পাওয়াটা প্রায়শ কষ্টকর কারণ মাদকাসক্তি একটি চলমান প্রক্রিয়া। সুতরাং ধরেই নেয়া যায় সংখ্যাটা মোটেই এখানে থেমে নেই।

মাদকের সর্বগ্রাসী আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় শিকার দেশের যুব সমাজ। একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ সে দেশের যুব সমাজ। যুব সমাজ যদি মাদকে আসক্ত হয়, নানা অবক্ষয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে– তবে সে দেশের উন্নয়ন-সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত হতে পারে না। জাতির ভবিষ্যত সমস্যাসংকুল ও অনিশ্চিত হতে বাধ্য। আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, দেশের যুব সমাজের মধ্যে মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়ছে। বলা হয়ে থাকে, মাদকাসক্তদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬৫ শতাংশের মতো।

২০১৬ সালে বিশ্বের মাদক সমস্যা বিষয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে, সদস্য রাষ্ট্রের সরকারগুলোকে নতুন মাদক নীতিমালা নির্ধারণ করতে এক সঙ্গে নিয়ে আসে। নতুন এই মাদক নীতিমালা মানবিক এবং নারী ও যুব সমাজসহ সকলকে সম্পৃক্ত করেছে। মাদক নীতিমালাটি একটি সুস্পষ্ট বার্তা দেয়— নারী ও যুব সমাজের সম্পৃক্ততা ছাড়া মাদক নীতিমালা নিয়ে কোনো আলোচনা সম্ভব নয়। মাদক নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য এই প্রক্রিয়া অনুসরণের এখনই উৎকৃষ্ট সময়।

পত্র-পত্রিকায় এমন বহু খবর ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে যাতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়, শিশু-কিশোর, মহিলা এবং এমনকি বিভিন্ন পেশাজীবীর মধ্যেও মাদকাসক্তি বিস্তার লাভ করছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বা এই পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকের আসক্তি ব্যাপক আকার নিয়েছে। এ রকম খবর আছে, মাদক ব্যবসায়ীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের বিশেষ টার্গেটে পরিণত করেছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদক বিক্রিই নয়, মাদক পরিবহন ও বিপণনের কাজেও তারা তাদের ব্যবহার করছে। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় এটি করা হচ্ছে।

এ কথা তিক্ত হলেও সত্য, সহজ প্রাপ্যতা মাদকের বিস্তার ও আসক্তের সংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ। সাগর ও সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট হয়ে মাদক সামগ্রী দেশে অনুপ্রবেশ করছে। ইয়াবা-ফেন্সিডিল থেকে শুরু করে এমন কোনো মাদক নেই যা দেশে ঢুকছে না। সীমান্ত পথে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই তা ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন স্থানে। আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানিচক্র বাংলাদেশকে ট্রানজিট কান্ট্রি হিসেবে ব্যবহার করছে অনেক দিন ধরে। এই চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে।
সরকার ও প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্বিচারে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে এসব মাদক চোরা কারবারি নেটওয়ার্ক।

মাদকাসক্তির বিস্তার রোধ করতে হলে পরিবার,সমাজ এবং রাষ্ট্রকে একযোগে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সন্তান তার পরিবারের পরিবেশ দ্বারা অনেক প্রভাবিত হয়। তাই পারিবারিক পরিবেশ হতে হবে ধূমপান মুক্ত। সন্তানদের কার্যকলাপ ও সঙ্গীদের ব্যাপারে খবর রাখতে হবে। সন্তানরা যেসব জায়গায় যাওয়া আসা করে সে জায়গাগুলো সম্পর্কে জানতে হবে। সন্তানদের সাথে খোলামেলা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।

মাদকাসক্ত হয়ে গেলে পরিবাররে প্রতিটি সদ্যসকে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে সেই অবস্থা থেকে বের করে আনার সর্বাত্মক প্রয়াস চালাতে হবে। প্রয়োজনে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে।

সন্তান মাদকাসক্ত থেকে সুস্থ্য হয়ে ফিরে আসলে পুনরায় যেন মাদকে জড়িয়ে না পড়ে পিতামাতাকে সর্বদা সচেতন থাকতে হবে।
প্রত্যেক পিতামতাই চায় তাঁর সন্তানের সুস্থ্য ও সুন্দর জীবন ।সেজন্য পিতামাতাকে বুঝে নিতে হবে তাঁর সন্তানের জন্য কোনটি সঠিক, কোনটি ভুল

মাদকাসক্তি নির্মূলে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিৎ। প্রতিটি পাড়া বা মহল্লায়,স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদক বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং মাদক বিরোধী কমিটি গঠন করতে হবে।
জনসচেতনামূলক বিভিন্ন সভা সমাবেশ করা যেতে পারে। রাস্তায় রাস্তায় মাদকাসক্তি বিরোধী ব্যানার,পোস্টার ও লিফলেট বিতরণ করা যেতে পারে।

মাদকাসক্তির বিস্তার রোধে সর্বস্তরে ধর্মীয় শিক্ষা ও মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। বিশেষ করে ইসলামী শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে। প্রতিটি পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রকে ইসলামী শিক্ষার ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে।

সরকারকে মাদকাসক্তি নির্মূলে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রচলিত আইনকে প্রয়োজনবোধে পরিবর্তন করা আবশ্যক। তামাকজাত দ্রব্য হতে শুরু করে সকল প্রকার নেশাজাত দ্রব্য পুরোপুরি নিষিদ্ধ রেখে আইন করতে হবে। প্রশাসন কে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখতে হবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে। কখনও কখনও সীমান্তবর্তী মাদক ব্যবসায়ীরা সীমান্ত রক্ষীদের দ্বারাই তাদের মাদক দ্রব্য আমদানি ও বাজারজাত করে থাকে যার প্রমাণ ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি।
সুতরাং সরকার ও প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। যারা মাদক চোরা কারবারে জড়িতে তাদেরকে কঠোর হতে কঠোরতম শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

সর্বোপরী, জনসচেতনতাই এই সমস্যা উত্তরণের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পথ। মাদক বিরোধী সকল কার্যক্রম পরিচালনা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু আমাদের দায়িত্বও কোন অংশে কম নয়। কেননা এই মাদকাসক্ত ব্যক্তি আমি, আপনি অথবা আমাদেরই কারো না কারো সন্তান।

লেখক : কবি ও কলামিষ্ট

নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক কলিকাল।

ই-মেইল : smlalon1992@gmail.com

মন্তব্য করুন

এ বিভাগের আরও খবর

ফটোগ্যালারী

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০ 
কলিকাল | সত্য-সংবাদ-সুসাংবাদিকতা
Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.