খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা থানাধীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-৯ আসনটি জনবহুল এলাকা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বী ১২ জন। তাদের প্রায় সবাই প্রার্থী হিসেবে নতুন এবং অনেকেই বয়সে তরুণ।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১২ জন প্রার্থী থাকলেও এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদের সঙ্গে ১১ দলীয় জোটের এনসিপির প্রার্থী মোহাম্মদ জাভেদ মিয়া ও এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা নেত্রী ডা. তাসনিম জারার সঙ্গে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। তবে ডা. জারার কারণে অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন বিএনপি প্রার্থী।
এ আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে হাবিবুর রশিদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির শাপলা কলি প্রতীকে মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া, ফুটবল প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে কাজী আবুল খায়ের, সিপিবির কাস্তে প্রতীকে মো. মনিরুজ্জামান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকে শাহ ইফতেখার আহসান, বিএনএফের টেলিভিশন প্রতীকে মোহাম্মদ শফি উল্লাহ চৌধুরী, এনপিপির আম প্রতীকে শাহীন খান, মার্কসবাদী বাসদের কাঁচি প্রতীকে খন্দকার মিজানুর রহমান, গণফোরামের উদীয়মান সূর্য প্রতীকে নাজমা আক্তার, হারিকেন প্রতীকে মুসলিম লীগের প্রার্থী মাসুদ হোসেন ও ইনসানিয়াত বিপ্লবের আপেল প্রতীকে নাহিদ হাসান চৌধুরী জুনায়েদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা থানাধীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-৯ আসনে মোট ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৩৬০ জন ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৭ হাজার ৬৭৩ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৩১ হাজার ৬৮২ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৫ জন। আসনটি জনবহুল ও মিশ্র আবাসিক-বাণিজ্যিক এলাকা। খিলগাঁওয়ে মূলত মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের বাস। বাসাবো ও দক্ষিণ বনশ্রী বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। মুগদা দ্রুত বর্ধনশীল এলাকা হিসেবে বাণিজ্যিক ও যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া মান্ডা, মাদারটেক, গোড়ান ও নন্দীপাড়া বেশ ঘনবসতিপূর্ণ। মুগদা মেডিকেল কলেজ, খিলগাঁও ফ্লাইওভার, বাসাবো বৌদ্ধমন্দির এ আসনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এ আসনটি বরাবরই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনি ডামাডোল শুরু হওয়ার পর বিএনপি ও জামায়াতের সম্ভাব্য কয়েকজন হেভিওয়েট প্রার্থীকে ঘিরে মাঠ বেশ সরগরম ছিল।
নির্বাচনি প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস এবং জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সংগঠন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি কবির আহমদ। নির্বাচনি এলাকাজুড়ে তাদের ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টারের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট।
তবে বিএনপি ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদকে প্রার্থী করায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান আফরোজা আব্বাস। অন্যদিকে জোটের কারণে জামায়াতের কবির আহমদ এবং খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মো. ফয়েজ বখশ সরকার নিজেদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। ফলে আলোচনার বাইরে থাকা নেতাদের প্রার্থী করায় ভোটের অঙ্কে এসেছে বড় পরিবর্তন।
এলাকাবাসীর অনেকেই জানান, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হাবিবুর রশিদ, ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া (জাবেদ রাসিন) এবং এ আসনের একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা আলোচনার কেন্দ্রে করেছেন। তবে এনসিপির প্রার্থীর ভোটে কিছুটা হলেও ভাগ বসাবেন এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া ডা. জারা। এতে বিএনপির হাবিবুর রশিদের জয় পেতে কিছুটা সহজ হবে।
পরিবর্তনের রাজনীতির আহ্বান জানিয়ে চিকিৎসক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ডা. তাসনিম জারার প্রচার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং তরুণ ও নারী ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ফুটবল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এ প্রার্থীকে ঘিরে তরুণ ভোটারদের মধ্যে কৌতূহল ও আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে তিনি শিক্ষিত, তরুণ ও প্রথমবার ভোট দেওয়া ভোটারদের মধ্যে বিশেষ কৌতূহল তৈরি করেছেন।
তিনি বলেন, তার বাবা-দাদারা এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা। তিনিও এখানে বড় হয়েছেন। এলাকার অলিগলি ও মানুষের সমস্যার সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই তিনি পরিচিত। তাই এ আসনকেই বেছে নিয়েছেন তিনি। দুই প্রধান জোটের বাইরে অবস্থান করায় তিনি কতটা ভোট টানতে পারবেন, তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে রাজনৈতিক মহলে।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া এলাকার উন্নয়ন, নাগরিক সেবার প্রতিশ্রুতি সামনে রেখে প্রচার চালাচ্ছেন। ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট’ এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার ‘আমূল সংস্কারের’ কথা বলছেন। এ ছাড়া চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও গডফাদার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান তুলে ধরছেন নির্বাচনি প্রচারে।
তিনি বলেন, অনেক এলাকায় এখনও মানুষ সাঁকো ব্যবহার করে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে। মুগদা হাসপাতালকে দালালমুক্ত করা এবং সাধারণ মানুষের জন্য ভ্রাম্যমাণ অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করা তার অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, মানুষ পরিবর্তন চায়, আর সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবে তরুণ প্রজন্ম।
অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রশিদের সাবেক ছাত্রনেতা হিসেবে এলাকায় ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। দলের শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত এবং ধানের শীষের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। কারিগরি শিক্ষা, ফ্যামিলি কার্ড ও উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে এলাকার নারী উন্নয়নের অঙ্গীকারের পাশাপাশি রাস্তাঘাট উন্নয়নের কথাও বলছেন ভোটারদের। এলাকায় জনসভা ও পথসভা করে জলাবদ্ধতা নিরসন, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানসহ নির্বাচিত হলে নিজের নির্বাচনি এলাকাকে একটি পরিকল্পিত ও মডেল এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তিনি।
নিজেকে স্থানীয় প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরে হাবিবুর রশিদ বলেন, এ এলাকার প্রতিটি অলিগলি তার পরিচিত। এলাকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশা তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনেকেই এই এলাকার স্থানীয় নন, ফলে তারা এখানকার মানুষের প্রকৃত সমস্যাগুলো বুঝতে পারবেন না। বিষয়টি এলাকার সাধারণ মানুষও অনুধাবন করতে পেরেছে। এ কারণে নির্বাচনে তার প্রতি মানুষের আস্থা অনেক বেশি তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
অনেকের ধারণা— বিএনপির সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ও আগের ভোটব্যাংককে কাজে লাগিয়ে তিনি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। বাসাবো এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম জানান, খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা এলাকার বেহাল সড়ক, জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ সমস্যা, যানজট ও নাগরিক সেবার ঘাটতি নির্বাচনি আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। দীর্ঘদিন সাবের হোসেন চৌধুরী এলাকার এমপি থাকলেও এলাকার উন্নয়ন প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। বিশেষ করে এলাকার রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই বেহাল। সাধারণ ভোটাররা প্রার্থীদের কাছে এসব সমস্যার সমাধান কীভাবে করবে তার প্রতিশ্রুতি চাইছেন। শেষ মুহূর্তে যারা জলাবদ্ধতা নিরসন, বেহাল সড়ক সংস্কার এবং দীর্ঘদিনের স্থানীয় নাগরিক সমস্যাগুলো সমাধানে সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত ‘রোডম্যাপ’ তুলে ধরতে পারবেন, ভোটের মাঠে বিজয়ের পাল্লা শেষ পর্যন্ত তাদের দিকেই ঝুঁকতে পারে বলে ধারণা।
খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, এ নির্বাচনি এলাকায় কিশোরগ্যাং, মাদক ও সন্ত্রাসীদের তৎপরতা রয়েছে দীর্ঘদিন ধরেই। রাস্তাঘাটের বেহালদশায় বাসাবো-মাদারটেক এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভুগছে। তাই এলাকার মানুষ এমন কোনো প্রার্থীকে এবার বেছে নেবে যে প্রার্থীর দল ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে।








