আজ পবিত্র রমজানের ১৭তম দিন। প্রায় দেড় হাজার বছর আগে এদিন আরবের ঐতিহাসিক বদর প্রান্তে মুখোমুখি হয়েছিল সত্য এবং মিথ্যার দুটো দল।
আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত নিয়ে যখন ইসলাম ধর্মের প্রচার শুরু করেন নবীয়ে রহমত হজরত মুহাম্মদ (সা.), মক্কার অমুসলিমরা এতে বাধা দিতে শুরু করে। নওমুসলিমদের ওপর চালাতে থাকে অমানবিক নির্যাতন। একপর্যায়ে আল্লাহর হুকুমে নবী করিম (সা.) হিজরত করলেন মদিনায়। সেখানে সব অধিবাসীকে নিয়ে মদিনা রাষ্ট্র গঠন করলেন। মুসলমানদের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন সহ্য করতে পারল না মক্কার কাফেররা। তারা ইসলামের জনপ্রিয়তা, বিস্তৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা দেখে ইসলামের চরম শত্রুতায় অবতীর্ণ হলো। একপর্যায়ে বেজে উঠল বদর যুদ্ধের দামামা।
দ্বিতীয় হিজরির ১৬ রমজানে মক্কার কুরাইশদের নেতৃত্বে আসা যুদ্ধ বাহিনী মদিনা থেকে ৮০ মাইল বা ১৩০ কিমি. দূরত্বে বদর প্রান্তরে সুবিধাজনক স্থানে তাঁবু স্থাপন করে। আবু জাহেলের নেতৃত্বে কুরাইশ বাহিনী মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করার ঘোষণা জানায়। অসুবিধাজনক বালুকময় স্থানে অবস্থান করে মুসলিমরাও প্রতিহতের ঘোষণা দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) যিনি মুসলমানদের প্রতি সদয়, কাফেরদের প্রতি কঠোর- তিনি আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলেন। সিজদায় অবনত হয়ে বলতে লাগলেন, এ মুষ্টিমেয় মুসলিম যারা আজ তোমার নাম জপে, তোমার ওপর ঈমান এনেছে, আজ যদি তাদেরকে ধ্বংস করে দাও তা হলে তোমার ইবাদত করার মতো কেউ থাকবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিনীতভাবে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলেন। আল্লাহ সাহায্য করলেন।
বিজয়ের ওয়াদা করলেন। রাতেই রহমতের বৃষ্টিতে মুসলিম স্থলে বালু জমে চলাচল উপযোগী হয়ে গেল। অমুসলিমদের স্থল কর্দমাক্ত হয়ে গেল। আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতা নাজিল হলো। আল্লাহর সাহায্য যেখানে আছে সেখানে বিজয় আসবেই। এ জন্য নিজের জীবন দেওয়ার প্রয়োজন হলে সেখানে নিজেদের উৎসর্গিত করতে হবে।
১৭ রমজান সকালে কাফেররা মল্লযুদ্ধের জন্য আহ্বান জানাল। তিনজন কাফেরের বিরুদ্ধে তিনজন আনসারি সাহাবি এগিয়ে গেলেন। কাফেররা উদ্ধত, উন্নাসিক আচরণ করে আহ্বান জানাল মুহাজিরদের পাঠানোর জন্য। হজরত আমির হামযা (রা.), আলি (রা.) ও উবাইদা (রা.) এগিয়ে গেলেন। প্রথম ধাপে তিনজন কাফেরই পরাজিত হয়ে মৃত্যুবরণ করল। পুরোপুরি যুদ্ধ শুরু হলে সাহাবায়ে কেরাম জীবনবাজি রেখে যুদ্ধে শরিক হলেন। উমায়ের ইবনুল হুমাম আনসারি প্রথম শহিদ হলেন বদর প্রান্তরে। একে একে সাদ (রা.), উবাইদা (রা.), আকিল (রা.), আউফ (রা.), হারিছ (রা.), মুয়াওয়িজ (রা.) ও আম্মার (রা.)সহ মোট আটজন মুহাজির, ছয়জন আনসারি শহিদ হলেন। তাদের জীবনের বিনিময়ে ইসলামের প্রথম বড় বিজয় এলো। এ বিজয়ের অভিযানে মাত্র ৩১৩ জন নিরস্ত্র সাহাবি অংশগ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে এক হাজার সশস্ত্র কুরাইশ যোদ্ধা অংশ নিয়ে ছিল মুসলিমদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য। এ যুদ্ধে মুসলিমরা ধ্বংস হলেন না। ধ্বংস হলো কাফির শক্তির আবু জাহেল উতবা শায়বাসহ ৭০ জন নেতৃস্থানীয় অমুসলিম। বন্দি হলো আরও ৭০ জন।
আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের শেখালেন অস্ত্র আর সৈন্যবাহিনীর আধিক্যের কারণে বিজয় আসে না; বিজয় আসে পরিপূর্ণভাবে রবের কাছে রিজেদের সঁপে দেওয়ার মাধ্যমে। বিজয় আসে পিছুটানহীন জীবন উৎসর্গকারী কিছু মুসলিমদের কারণে। বদরের এ বিজয় মুসলিমদের কারণে। বদরের এ বিজয় মুসলিমদের সুযোগ করে দিয়ে ছিল আরও মাথা তুলে চলার জন্য। অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করে সারা বিশ্বের মালিকের কাছেই মাথা নত করার শিক্ষা দিয়ে যায় বদর। প্রতি রমজানের ১৭ তারিখে মনে করিয়ে দেয় তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা সত্যের ওপর অটল থাক। এ রমজান বিজয়ের বার্তা দিয়ে যায়। এ বার্তা সফল হয়েছিল বদরে, এ বার্তা সফল হয়েছিল মক্কা বিজয়ে। এখনও বিজয় আসবে প্রকৃত মুসলিমদের আত্মত্যাগে।








