আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশে যখন নির্বাচনী প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন নির্বাচন বানচাল করার লক্ষ্যে পতিত আওয়ামী লীগ মরিয়া হয়ে উঠেছে বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি। এসব সূত্রের মতে, পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য দুটি। একদিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যেন একটি গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে ব্যর্থ হয় সে লক্ষ্যে দেশজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করা, অন্যদিকে নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতা হস্তান্তরের ভিন্ন কোনো পথ উন্মুক্ত করার পরিস্থিতি তৈরি করা।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু এই সময়সীমাকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কাঠামো দুর্বল করার কৌশল নিয়ে কাজ চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধাভোগী পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য বাহিনীর একটি অংশকে নতুন করে সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। গত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখা অন্তত দুই শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তার একটি নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে সাবেক আইজিপি শহিদুল ইসলাম ও বেনজীর আহমেদ, সিটিসির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ এবং সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারের মতো কর্মকর্তাদের নাম আলোচনায় এসেছে। যদিও এদের কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং অনেকেই বিদেশে অবস্থান করছেন, তবে তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা এখনো বিভাগীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে বলে সূত্র দাবি করেছে।
আওয়ামী লীগ আমলে প্রভাবশালী ছিলেন এমন কয়েকজন সাবেক সচিব ও শীর্ষ আমলাও এই পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। আলোচনায় আসা নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন আবুল কালাম আজাদ, ড. আহমেদ কায়কাউস, ড. কামাল চৌধুরী, নজিবুর রহমান ও কবির বিন আনোয়ার। সূত্রের দাবি, তাদের অনেকে বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করলেও দেশে থাকা সহযোগীদের মাধ্যমে প্রশাসনের ভেতরে নীরব প্রভাব বজায় রাখছেন।
এ ছাড়া ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা নির্বাচন কমিশনের সাবেক কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় রয়েছে এমন তথ্য নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট সাবেক সচিবরা বর্তমানে কারাগারে, তবু তাদের সহযোগীরা নির্বাচনকালীন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র অনুযায়ী, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে আন্দোলনের পরিকল্পনা রয়েছে পতিত আওয়ামী লীগের। লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠী যাদের আন্দোলনে প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সরকারি ও বেসরকারি সেবা খাতে অস্থিরতা সৃষ্টি করাই এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য।
এই আন্দোলনের নেপথ্যে নিষিদ্ধঘোষিত যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগের ঢাকায় অবস্থানরত শীর্ষ নেতারা সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ছদ্মবেশে অবস্থান করছেন- এমন তথ্যও পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনা। সূত্র জানায়, এর অর্ধেক অর্থ পুলিশ, প্রশাসন ও নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাবিত করতে এবং বাকি অর্থ মাঠপর্যায়ের আন্দোলন জোরদারে ব্যয় করার চিন্তা রয়েছে। এই অর্থের বড় অংশ এসেছে এমন শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে, যারা আওয়ামী লীগ আমলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল সুবিধা নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শেখ হাসিনার পতনের ১৭ মাস পর ভারতে প্রথম সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামী লীগ। দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে দলের শীর্ষ নেতারা অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করেন এবং নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আওয়ামী লীগের দাবি, ইউনূস সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে অক্ষম এবং দলটিকে ভয় পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যখন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করছে, তখন দেশের বাইরে বসে নির্বাচন-প্রক্রিয়া নিয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার মতে, নির্বাচন বানচাল হলে গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার পথ আবারও বাধাগ্রস্ত হবে।
নির্বাচনের আর মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি। এই সময়ে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং দৃঢ় অবস্থানই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ একটি বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পথে ফিরতে পারবে কি না।







