দীর্ঘ নির্বাসন, নির্যাতন, বিতর্ক ও মামলা-মোকদ্দমা পেরিয়ে রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একসময় যাকে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ধরে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবেশে তিনি এখন বিএনপির একক নেতৃত্বে উঠে এসেছেন। জাতীয় রাজনীতিতেও তৈরি হয়েছে নতুন বলয়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারেক রহমান আধুনিকও হয়েছেন।
২০০৭ সালের ৭ মার্চ গ্রেফতার হওয়া তারেক রহমান রিমান্ডে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন এবং গুরুতর শারীরিক জখম নিয়ে ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। তখন গুঞ্জন ছিল- তিনি মুচলেকা দিয়ে রাজনীতি ছাড়ছেন। তবে ১৭ বছরে লন্ডন থেকে দলের নেতৃত্ব ধরে রাখা সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে।
দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রযন্ত্র, সরকারি প্রচার ও পাঠ্যপুস্তকে তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অভিযোগ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চললেও ২০২৪ সালের পরিবর্তনের পর উচ্চ আদালতের ধারাবাহিক রায়ে তিনি বেকসুর খালাস পান।
আদালতের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট বলা হয়েছে- তারেক রহমানকে যুক্ত করার মতো নির্ভরযোগ্য কোনো দালিলিক প্রমাণ রাষ্ট্রপক্ষ দেখাতে পারেনি।
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ভার্চুয়ালি উপস্থিতিতে নতুন নেতৃত্বগুণ দেখিয়ে তারেক রহমান প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তার বক্তব্য ও আচরণে ধীরতা, পরিপক্কতা- এমনকি সমালোচকদের কাছ থেকেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে। জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্ব কোনো দলের নয়, শিক্ষার্থী ও জনতার বলে উল্লেখ করে তিনি উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বার্তা দিয়েছেন।
জরুরি সময়ে প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার আহ্বান এবং দলের মধ্যে অনিয়ম, দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির ঘটনায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রয়োগ করে তারেক রহমান দলের শৃঙ্খলা পুনর্গঠনে কঠোর ভূমিকা রেখেছেন।
অপরদিকে শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বহিষ্কার বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দলের ভেতরে পরিষ্কার সংকেত দিয়েছে-‘দলের নামে অপকর্মে কোনো ছাড় নেই।’
রাষ্ট্র পুনর্গঠনের লক্ষ্যে তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন ‘৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামত রূপরেখা’।
কৃষক-শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ইউনিভার্সাল হেলথ কার্ড, বেকার ভাতা, দ্বিকক্ষ সংসদ- সবই আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক কল্যাণরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি। দলের ভেতরে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় তিনি পাঁচস্তর বিশিষ্ট স্বচ্ছ ও কাঠামোগত পদ্ধতি চালু করে ‘লবিং ও টাকার রাজনীতি’ ভেঙেছেন, যা দেশে নজিরবিহীন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এ বছর ৬০ বছরে পা রাখা তারেক রহমান জন্মদিনেও দলকে কেক কাটা-উৎসব থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেন শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও জাতীয় বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে। এটিকে তার রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও পরিপক্বতার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে জনমনে প্রশ্ন- তিনি কবে দেশে ফিরবেন। মামলা-মোকদ্দমার জটিলতা কেটে যাওয়ায় দলীয় সূত্র বলছে- তিনি ‘পলাতক’ তকমা ঘুচিয়ে আইনি সম্মান নিয়েই ফিরবেন। তৃণমূল নেতাকর্মীদের অপেক্ষা এখন তারেক রহমানের সশরীরে নেতৃত্ব দেখার।
রাজনীতিতে দীর্ঘ নির্বাসন, ত্যাগ ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তারেক রহমান আজ বিএনপির নেতৃত্বের কেন্দ্রেই নন, বরং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের নতুন আলোচনারও কেন্দ্রবিন্দুতে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমানের রাজনৈতিক সত্তায় শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গভীর দেশপ্রেম এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন চেতনার এক অনন্য সংমিশ্রণ ঘটেছে, যা তাকে গণমানুষের হৃদয়ে স্থান করে দিয়েছে। তিনি মায়ের মতোই গণতন্ত্রের প্রশ্নে অবিচল থাকার প্রমাণ দিয়েছেন। তিনি পারিবারিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হয়েই ক্ষান্ত হননি; বরং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতির সঙ্গে তাল মেলানো এবং সময়ের প্রয়োজনে নিজেকে প্রতিনিয়ত নবায়ন করে তিনি বাবা-মায়ের ছায়া ছাপিয়ে এক ‘স্বতন্ত্র ও আধুনিক তারেক রহমান’-এ পরিণত হয়েছেন।
তারেক রহমানের রাজনীতির ভিত্তি শহিদ জিয়াউর রহমান ও আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার হলেও তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পারিবারিক ট্র্যাজেডিকে কখনোই রাজনৈতিক পণ্যে রূপান্তর না করার অনন্য মানসিকতা। শৈশবে পিতাকে হারানো, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর প্রবাসে মৃত্যু, মায়ের দীর্ঘ কারাবাস এবং ১/১১-তে নিজের ওপর অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েও তিনি সদ্য পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার মতো ‘স্বজন হারানোর বেদনা’ বা ‘এতিম’ পরিচয়কে ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেননি।
শেখ হাসিনা যেখানে আবেগের কার্ড খেলে সহানুভূতি আদায়ের রাজনীতি করেছেন, সেখানে তারেক রহমান পাহাড়সম ত্যাগ ও নির্যাতনের পরেও প্রতিশোধ বা আবেগের সস্তা প্রদর্শনী না করে রাষ্ট্র সংস্কার, ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ ও আইনের শাসনের কথা বলে নিজেকে এক অনন্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যা তাকে সমসাময়িক রাজনীতিতে শেখ হাসিনার চেয়ে গুণগত ও আদর্শিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
এমন অবস্থায় রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলেন, তারেক রহমানের সামনের পথটি মসৃণ নয়। আইনি বাধা-বিপত্তি পার হয়ে দেশে ফিরে আসা, দলের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ঘোষিত ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা বাস্তবায়ন করা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পারিবারিক বিয়োগান্তক ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক হাতিয়ার না করে তিনি যে সংযত আচরণের পরিচয় দিয়েছেন, তা তার ভাবমূর্তিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তারা আরো বলেন, দেশবাসী এখন দেখার অপেক্ষায়- দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক সময়ের এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক কৌশল কাজে লাগিয়ে তিনি আগামী দিনের বাংলাদেশকে কোন পথে উন্নতিতে ধাবিত করেন।









