জুলাইবিরোধী তালিকায় থাকা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন।
অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৩ শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত এবং ৩৩ শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার ও সনদ বাতিল করা হয়েছে।
আজ শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের একাধিক সদস্য। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭১তম সিন্ডিকেট সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একাধিক সিন্ডিকেট সদস্য জানিয়েছেন, জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ১৯ জন শিক্ষক ও ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে শাস্তি নির্ধারণ কমিটি গঠন করবেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ।
একই অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে ৩৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে যারা ইতোমধ্যে পড়াশোনা শেষ করেছেন, তাদের সনদ বাতিল করা হয়েছে। আর অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিন্ডিকেট।
শোকজ প্রাপ্ত শিক্ষকরা হলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান, ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. পরেশ চন্দ্র বর্মন, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. দেবাশীষ শর্মা, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. বাকি বিল্লাহ ও অধ্যাপক ড. রবিউল হোসেন, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপদ্ধতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী আখতার হোসেন ও অধ্যাপক ড. শেলীনা নাসরিন, ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. এইচ. এম আক্তারুল ইসলাম ও অধ্যাপক ড. মিয়া রাসিদুজ্জামান, ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল আরফিন, ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. তপন কুমার জোদ্দার, আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহজাহান মণ্ডল ও অধ্যাপক ড. রেবা মণ্ডল, মার্কেটিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাজেদুল হক, ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আফরোজা বানু, আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের অধ্যাপক ড. আমজাদ হোসেন, ল অ্যান্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মেহেদী হাসান এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জয়শ্রী সেন।
তালিকায় ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারী হলেন, প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখার উপ-রেজিস্ট্রার আলমগীর হোসেন খান ও আব্দুল হান্নান, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দফতরের সহকারী রেজিস্ট্রার ও কর্মকর্তা সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিদ হাসান মুকুট, একই দফতরের উপ-রেজিস্ট্রার আব্দুস সালাম সেলিম, প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখার উপ-রেজিস্ট্রার ড. ইব্রাহীম হোসেন সোনা, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শাখা কর্মকর্তা উকীল উদ্দিন, ফার্মেসি বিভাগের জাহাঙ্গীর আলম (শিমুল), আইসিটি সেলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জে এম ইলিয়াস, অর্থ ও হিসাব বিভাগের শাখা কর্মকর্তা তোফাজ্জেল হোসেন, তথ্য, প্রকাশনা ও জনসংযোগ দফতরের উপ-রেজিস্ট্রার (ফটোগ্রাফি) শেখ আবু সিদ্দিক রোকন এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দফতরের সহকারী রেজিস্ট্রার মাসুদুর রহমান।
এছাড়া শিক্ষার্থীরা হলেন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের বিপুল খান, অর্থনীতি বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের মেহেদী হাসান হাফিজ ও শাহীন আলম, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের রতন রায়, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের মুন্সি কামরুল হাসান অনিক, মার্কেটিং বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের হুসাইন মজুমদার, বাংলা বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের তরিকুল ইসলাম, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের মৃদুল রাব্বী, ইংরেজি বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ফজলে রাব্বী, ল অ্যান্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শাকিল, ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিমুল খান, আইন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের কামাল হোসেন, ইংরেজি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের মাসুদ রানা, আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের মেজবাহুল ইসলাম, সমাজকল্যাণ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের অনিক কুমার, বাংলা বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের আব্দুল আলিম, ল অ্যান্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের বিজন রায়, শেখ সোহাগ ও শাওন, অর্থনীতি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের তানভীর ও শেখ সাদি, সমাজকল্যাণ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের মাজহারুল ইসলাম, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের মনিরুল ইসলাম আসিফ, সমাজকল্যাণ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের মারুফ ইসলাম, চারুকলা বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের পিয়াস, বাংলা বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ফারহান লাবিব ধ্রুব, আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের প্রাঞ্জল, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের নাবিল আহমেদ ইমন, ফিনান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের রাফিদ, লোক প্রশাসন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের আদনান আলি পাটোয়ারি, ল অ্যান্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের লিয়াফত ইসলাম রাকিব এবং ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ইমামুল মুক্তাকী শিমুল।
এর আগে, জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখা শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করতে গত ১৫ মার্চ আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার হোসেনকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রশাসন।
পরে প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রদত্ত লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ, বিভিন্ন তথ্যচিত্র, ভিডিও ফুটেজ এবং পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে কমিটি উক্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের জুলাই-আগস্ট বিপ্লব বিরোধী ও নিবর্তনমূলক কার্যকলাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পায়। কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়। পরবর্তীতে কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিন্ডিকেট সভায় তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, প্রকাশ্যে বিরোধিতাকারী শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও তাদের উস্কানীদাতা এবং পেছন থেকে আন্দোলন দমনকারী রাঘববোয়ালরা বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে শিক্ষার্থীরা।
তবে তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলমান রয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।








