নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন সরকার। এ সিদ্ধান্তের ফলে ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা এ মওকুফের আওতাভুক্ত হবে। এতে প্রায় ১২ লাখ কৃষক লাভবান হবেন।
বৃহস্পতিবার ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে নতুন মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক প্রথম বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কৃষিবিদরা বলছেন, সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে প্রান্তিক ক্ষুদ্র কৃষকরা কৃষি খাতের প্রতি উৎসাহিত হবেন। এতে কৃষিপণ্য উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কৃষি উৎপাদন বাড়বে ও আমদানিনির্ভরতা কমবে।
মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরে বিকালে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি সাংবাদিকদের জানান, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ নেওয়ার পর যত সুদই হোক, সুদ-আসলসহ পুরোটা মওকুফ হবে। অর্থ বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে বুধবার পর্যন্ত নেওয়া কৃষকদের ঋণ মওকুফের আওতায় আনা হবে। সুদসহ এ পাওনার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা।
এ সিদ্ধান্তে প্রায় ১২ লাখ কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা ঋণের দায়মুক্ত হয়ে নতুন করে উৎপাদনে মনোনিবেশ করতে পারবেন।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঋণ মওকুফের ফলে কৃষকদের ক্রেডিট রেকর্ড উন্নত হবে। ফলে তারা ভবিষ্যতে ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে ঋণ নিতে পারবেন এবং উচ্চ সুদের মহাজনি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমবে। ঋণের বোঝা কমলে গ্রাম থেকে নগরে অভিবাসন হ্রাস এবং গ্রামীণ মূল্যস্ফীতি কমতেও সহায়ক হতে পারে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সরকারের ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ মেয়াদে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সুদ-আসল মওকুফ করা হয়েছিল, যা কৃষকদের কষ্ট লাঘব করে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল। এর মূল লক্ষ্য হলো দরিদ্র কৃষকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষি খাতের মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করা।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সুদসহ কৃষকদের কাছে পাওনা আছে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, যা এই মওকুফের আওতাভুক্ত হবে। এই ঋণ মওকুফ করা হলে আনুমানিক ১২ লাখ কৃষক প্রত্যক্ষভাবে লাভবান হবেন। ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা ঋণের দায় থেকে মুক্ত হতে পারবেন, যা তাদের কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি করবে এবং দেশের কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
নাসিমুল গনি বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে মাথার ওপর ঋণের বোঝা না থাকায় কৃষক পরবর্তী মৌসুমে নতুন উদ্যমে চাষাবাদ শুরু করতে সক্ষম হবেন। এ ছাড়া এই মওকুফ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কৃষকদের ক্রেডিট রেকর্ড বা ঋণমান ভালো হবে। ফলে তারা ব্যাংক থেকে পুনরায় স্বল্প সুদে কৃষিঋণ গ্রহণ করতে পারবেন, যা তাদের স্থানীয় মহাজনি ঋণের উচ্চ সুদের হাত থেকে রক্ষা করবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সাবেক পরিচালক ও অবসরপ্রাপ্ত বিসিএস কৃষি অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব কৃষিবিদ আহমেদ আলী চৌধুরী ইকবাল বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ভালো। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করে দিলে যারা গরিব ও ছোট কৃষকরা কৃষি খাতে উৎসাহ পাবে। এতদিন যারা ঋণগ্রস্থ ছিলেন তারা ঋণের বোঝা থেকে রেহাই পেলে কৃষির প্রতি মনোনিবেশ করবেন। এতে সারা দেশে কৃষিপণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
তিনি বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ে অনেক ক্ষুদ্র কৃষককে কৃষি পেশা ছেড়ে দিয়ে রিকশা বা অটো চালানোর কাজ করতে দেখা গেছে। সরকার যদি কৃষকদের পর্যাপ্ত সাহায্য সহযোগিতা করে তা হলে কৃষির উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি কৃষক ও কৃষি শ্রমিকরা লাভবান হবেন।
সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কৃষি খাতে বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।








