জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে গণভোট আয়োজন অথবা বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জারির পরামর্শ দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।
রোববার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তারা এই মত দেন।
দুই ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন, বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া ও ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক।
বৈঠকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল, জুলাই সনদের যে সংস্কার এজেন্ডা প্রস্তাব করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো কীভাবে গঠন করা যায়। এর আগে, গত ১০ আগস্ট এক বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য চারটি বিকল্প উপায় দিয়েছিলেন—অধ্যাদেশ জারি, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের মতামত গ্রহণ, গণভোট এবং গণপরিষদ গঠন।
তবে সর্বশেষ বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অধ্যাদেশ জারি করে সংবিধানের কোনো বিধান পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ, সংবিধানের ৯৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই পথে সাংবিধানিক পরিবর্তনের সুযোগ নেই। ফলে অধ্যাদেশের পথটি বাতিল বলে বিবেচিত হয়েছে। পাশাপাশি ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের মতামত গ্রহণ নিয়েও আলোচনা হয়নি।
বৈঠকে মূলত গণভোট এবং সাংবিধানিক আদেশ জারির বিষয়েই গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা জানান, সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জনগণের অভিপ্রায়কে ভিত্তি করে একটি বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জারি করা যেতে পারে। পাশাপাশি সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসারে গণভোটের মাধ্যমেও এই সনদের বৈধতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
তারা আরও বলেন, রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণভোট একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। কারণ, গণভোটে জনগণ সরাসরি তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পাবেন। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একসঙ্গে গণভোটও আয়োজন করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ব্যালটে রাজনৈতিক প্রতীকের পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত একটি প্রশ্নও রাখা যেতে পারে।
বৈঠকে আলোচনার সময় এই বিষয়টিও উঠে আসে, রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে গণভোট আয়োজন কতটা সম্ভব হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি একটি ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি করা যায়, তাহলে আইনি ভিত্তি গড়ে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন সম্ভব।
জুলাই সনদের খসড়ায় বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগেই যে সংস্কারগুলো বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো কালক্ষেপণ না করে বাস্তবায়ন করবে সরকার। তবে খসড়ায় চারটি বিকল্প উপায়ের মধ্যে অধ্যাদেশ বাদ দিলেও বাকিগুলোর কোনো উল্লেখ করা হয়নি।
বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল সনদের আইনি ভিত্তি চায়। জামায়াতে ইসলামী চায় গণভোটের মাধ্যমে বাস্তবায়ন, এনসিপি চায় গণপরিষদ গঠন করে সংবিধান সংস্কার, আর বিএনপি বলছে—যেসব সংস্কারে সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন, সেগুলো তারা ক্ষমতায় গিয়ে বাস্তবায়ন করবে।
সনদের একটি অংশে উল্লেখ রয়েছে, সংবিধান ও আইনের ওপর সনদের প্রাধান্য থাকবে এবং সনদ নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। বিএনপি এই দুটি বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছে। তারা মনে করে, সনদের ওপর সংবিধানের প্রাধান্য থাকতে হবে। জামায়াত এতে একমত হয়েছে। এনসিপি সনদের আইনি ভিত্তি চাইলেও সংবিধানের ওপর প্রাধান্য দিতে রাজি নয়।
বৈঠকে আইন উপদেষ্টা জানান, বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার দ্রুত কার্যকরে সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এর জন্য আইন মন্ত্রণালয় একজন পরামর্শক নিয়োগ করেছে। তবে এ বিষয়ে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের আলাদা করে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, কমিশনের সদস্যরা জানিয়েছেন, তৃতীয় দফা সংলাপ শুরুর আগে সনদ বাস্তবায়নের একটি গ্রহণযোগ্য রূপরেখা চূড়ান্ত করতে চায় তারা। তবে কবে সংলাপ শুরু হবে, তা এখনও নির্ধারিত হয়নি।
রোববারের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য সফর রাজ হোসেন, বিচারপতি এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার।
বৈঠক শেষে কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সনদ বাস্তবায়নে আইনি বাধ্যবাধকতা কীভাবে তৈরি করা যায়, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। গণভোটসহ বিভিন্ন বিকল্প পথ আলোচনায় এসেছে। এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।








