আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রচার কার্যক্রম চলছে সারাদেশে। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন প্রার্থীরা। নিচ্ছেন নানা প্রস্তুতি। অন্যদিকে প্রচারের পাশাপাশি অভিযোগও বাড়ছে। ইসির তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে দেড় শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। এদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ৪৮ জনকে শোকজ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক নির্বাচন পরিচালনা শাখার এক কর্মকর্তা সময়ের আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা ১৪২টি অভিযোগ পেয়েছি। যদিও অভিযোগের সংখ্যা আরও বেশি হবে। কারণ মাঠ পর্যায়ের অভিযোগগুলো জেলা রিটার্নিং কার্যালয় ও ইনকোয়ারি কমিটির কাছে জমা দেয় তারা। সেগুলো অতিগুরুত্বপূর্ণ না হলে ঢাকা আসে না। কিছু অভিযোগ আছে যা সেখান থেকেই নিষ্পত্তি হয়ে যায়। এ ছাড়া ঢাকার নির্বাচন ভবনের ডেচপাচে যে অভিযোগগুলো জমা হয় সেগুলো কয়েকটি টেবিল ঘুরে শাখায় আসে। যে কারণে সঠিক সংখ্যা বলা মুশকিল। এ ছাড়া প্রতিদিনই অভিযোগ বাড়ছে। ফলে সংখ্যাটাও এক জায়গায় থাকছে না। এখন পর্যন্ত এ অভিযোগগুলো আমরা পেয়েছি। অনেক বিষয়ে কমিশন ব্যবস্থা নিয়েছে।
কী ধরনের অভিযোগ করা হচ্ছে- জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রার্থীদের অভিযোগ বেশি আচরণবিধি নিয়ে। এক পক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে। এ ছাড়া দলীয় অভিযোগও আছে। অনেক দল আছে যারা বলছে, প্রশাসন তাদের সহযোগিতা করছে না। এ রকম প্রার্থী, প্রশাসন, রিটার্নিং কর্মকর্তা, দলের বিরুদ্ধেসহ অনেক অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ এককথায় বহুমুখি অভিযোগ। কোনো একক বিষয় নয়।
অন্যদিকে, নির্বাচনি প্রচারে অবৈধ বাধা, কর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে গতকাল রোববার নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা স্বাক্ষরিত অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তার দল ৫টি আসনে জোটগতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। কিন্তু নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা ও প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকেই তাদের প্রার্থীরা উল্লিখিত আসনগুলোতে বিশেষ করে বরিশাল-৩ আসনে চরম বৈরী পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন স্থানে তাদের নেতাকর্মীদের প্রচারে বাধা দেওয়া হচ্ছে, যা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায়। এ বিষয়ে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা দৃশ্যত নিষ্ক্রিয় ও হতাশাজনক। অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দলের সাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল-৩ আসনের ‘ঈগল’ প্রতীকের প্রার্থী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ভূঁইয়ার (ব্যারিস্টার ফুয়াদ) নির্বাচনি কার্যক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এর সবশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে গত শুক্রবার মুলাদী পৌরসভার চরটেকি এলাকায় ব্যারিস্টার ফুয়াদের পক্ষে প্রচারে জামায়াতে ইসলামী মুলাদী পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি আরিফ বয়াতি ও তার সহকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। এসব ন্যক্কারজনক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তার অভাব বোধ করায় ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় মুলাদী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন বা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেছেন, নির্বাচন হওয়ার ব্যাপারে পরিবেশ সম্পূর্ণ আছে, সবাই কাজ করছে, মাঠ পর্যায়ে নির্বাচনের আমেজ তৈরি হয়েছে। যদি প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভূমিকা রাখে তা হলে নির্বাচনটা সুষ্ঠু হবে। তবে এখনও পরিবেশ তৈরি হয়নি, ঘাটতি আছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার প্রশাসন ও পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি দাবি করেছেন, প্রশাসন এবং পুলিশ যতটা নিরপেক্ষ থাকার কথা, ততটা নিরপেক্ষ নয়। তার কর্মীদের বাড়িঘরে হামলা, মারধর, বাড়িতে আগুন দেওয়ার মতো একাধিক ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।
রুমিন ফারহানা বলেন, আমার কাছে মনে হয়েছে প্রশাসন এবং পুলিশ যতটা নিরপেক্ষ থাকার কথা, ততটা নিরপেক্ষ নয়। তিনি বলেন, আমি একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বড় দলগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাচন করছি। এ অবস্থায় প্রশাসন যদি একদম স্ট্রেট নিরপেক্ষ না থাকে, তা হলে আরেকটা ৫ আগস্টের মতো কিংবা ২০১৮ সালের নির্বাচনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এর পরিণতি কারও জন্যই ভালো হবে না।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, নির্বাচনি অপরাধ, আচরণবিধি এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতিতে অনিয়ম সংক্রান্ত বিষয়াদির অনুসন্ধান করার জন্য তিনশ আসনে ‘ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি অ্যান্ড অ্যাডজুডিকেশন কমিটি’ করা হয়েছে। সংশোধিত আরপিওতে এই কমিটিকে নির্দিষ্ট নির্বাচনি ও ফৌজদারি অপরাধে বিচার করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। এটির প্রধান হচ্ছে একজন সিভিল জজ বা জয়েন ডিস্ট্রিক্ট জজ। সুতরাং কোনো প্রার্থীর যদি কোনো অভিযোগ থাকে সেটি তারা কমিটিকে জানাবে। সেখানে যদি সমস্যার সমাধান সম্ভব না হয় কিংবা সমস্যটা গুরুতর হয় তা হলে ওই কমিটি তদন্ত করে আমাদের কাছে পাঠাবে। তখন কমিশন বসে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু অনেক প্রার্থী আছেন এখানে এসে ইসিতে অভিযোগ করেন। এটি সঠিক মাধ্যম নয়। কারণ আমরা তো অভিযোগের তদন্ত করব না। আমরাও এই অভিযোগটা তাদের ফরোয়ার্ড করব। সুতরাং আমি অনুরোধ করব কারও অভিযোগ থাকলে আপনারা ‘ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি’ কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন তারা তদন্ত করে পাঠালে আমরা ব্যবস্থা নেব।








