মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা শেষ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতেই বিশ্ববাজারে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। সর্বশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য একটি শান্তি চুক্তির ইঙ্গিত দেওয়ার পর বাজারে ইতিবাচক সাড়া পড়েছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলেছে তেলের দামে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বুধবার গ্রিনিচ মান সময় ০১টা ০৩ মিনিটে আন্তর্জাতিক বাজারে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমে দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ১০৮ দশমিক ৩৫ ডলারে। আগের দিনের তুলনায় এটি ১ দশমিক ৫২ ডলার বা ১ দশমিক ৩৮ শতাংশ কম। এর আগের দিনও ব্রেন্টের দাম প্রায় ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ১ দশমিক ৫০ ডলার বা ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০০ দশমিক ৭৭ ডলারে নেমে এসেছে। আগের দিন এই সূচকেও প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ দরপতন হয়েছিল।
বিনিয়োগকারীদের ধারণা, যদি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত কমে আসে, তাহলে ওই অঞ্চলের তেল সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে। ফলে সরবরাহ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কমে যাবে এমন প্রত্যাশাই বাজারকে নিম্নমুখী করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দামে এই পতনের পেছনে মূল কারণ সরবরাহ পরিস্থিতি ঘিরে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে ঘিরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। অথচ বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই সরবরাহ হয়।
এই সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় গত সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২০২২ সালের মার্চের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তবে নতুন করে শান্তির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা জোরালো হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দামে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য একটি চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে সাময়িকভাবে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, অবরোধ বহাল থাকলেও চুক্তি স্বাক্ষরের সুযোগ তৈরি করতে সাময়িক বিরতি নেওয়া হয়েছে।
এই ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে জানান, আটকে পড়া তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে নিরাপদে প্রণালি পার করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনা ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে সক্রিয় হয়।
মার্কিন সামরিক বাহিনী সোমবার জানায়, তারা প্রণালিতে দুটি জাহাজকে নিরাপদে গালফ এলাকা থেকে বের করে আনার সময় ইরানের একাধিক ছোট নৌকা, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করেছে। এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে যে, অঞ্চলটি এখনো উচ্চমাত্রার সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই রয়েছে।
হরমুজ প্রণালির কার্যত অচলাবস্থার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি মজুত দ্রুত কমে এসেছে। সরবরাহ ঘাটতি পূরণে রিফাইনারিগুলো অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েছে, যা বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মজুতের সর্বশেষ চিত্রও বাজারের ওপর প্রভাব ফেলেছে। শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো কমেছে।
গত ১ মে শেষ হওয়া সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রুড অয়েল মজুত কমেছে প্রায় ৮ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল। একই সময়ে পেট্রোলের মজুত কমেছে ৬ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল এবং ডিস্টিলেট (ডিজেল ও হিটিং অয়েল) মজুত কমেছে ৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেল।








