ভূমিকম্প গবেষণায় কাজ করা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল বাংলাদেশে নতুন আরেকটি ভূগর্ভস্থ ফাটলরেখার সন্ধান পেয়েছে। এই ফাটলরেখাটি জামালপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে ভারতের কলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত—যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০০ কিলোমিটার। গবেষণায় দেখা গেছে, এর একটি অংশ ভূমিকম্পপ্রবণ এবং বাংলাদেশও সেই ঝুঁকির এলাকায় পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ফাটলরেখা সর্বোচ্চ ৬ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে।
এর আগে দেশে ডাউকি ফল্টলাইন এবং ইন্দো–বার্মা মেগাথ্রাস্টকে প্রধান দুটি ফাটলরেখা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এ ছাড়া সীতাকুণ্ড উপকূল, মধুপুর, শাহজিবাজার, জাফলং ও কুমিল্লার ফাটলরেখাও পরিচিত। নতুন ফাটলরেখা যুক্ত হওয়ায় ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যোগ হলো।
এই নতুন ফাটলরেখার অবস্থান শনাক্ত করেছেন বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আক্তারুল আহসান। তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, তুরস্ক ও বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা গবেষণায় অংশ নেন। আক্তারুল আহসান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অবার্ন ইউনিভার্সিটিতে ভূমিকম্পবিষয়ক পিএইচডি করছেন, এবং তার সহ–পরামর্শক হিসেবে আছেন খ্যাতিমান ভূ-পদার্থবিদ অধ্যাপক মাইকেল এস. স্টেকলার।
তিনি জানান, ১৪–১৯ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায় অনুষ্ঠিতব্য আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষণার বিস্তারিত উপস্থাপন করা হবে। ফাটলরেখাটিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে—এক অংশ কম মাত্রার, এক অংশ উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে, আর এক অংশ ঝুঁকিমুক্ত।
ফাটলরেখার ইতিহাস ও ভূতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট
গবেষণায় উঠে এসেছে, নতুন শনাক্ত ফাটলরেখার জন্ম ইউসিন যুগে, প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে। পরে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ বছর এটি নিষ্ক্রিয় ছিল, যা মায়োসিন যুগ হিসেবে পরিচিত। প্রায় ৫৬ লাখ বছর আগে ইন্ডিয়ান প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের চাপের ফলে মেঘালয় পর্বতমালা উত্থিত হওয়া শুরু করলে ফাটলরেখাটি আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ইন্ডিয়ান প্লেট এখনো প্রতিবছর প্রায় ৪৬ মিলিমিটার গতিতে ইউরেশিয়ান প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে—এ গতি কখনো উত্তরমুখী, কখনো উত্তর-পূর্বমুখী হয়েছে। এই চাপের জন্যই ডাউকি এবং নতুন ফাটলরেখার সৃষ্টি হয়েছে। গবেষকদের মতে, বেঙ্গল বেসিনে আরো অনেক ফাটলরেখা রয়েছে—কিছু ভূমিকম্প তৈরি করতে পারে, কিছু পারে না।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ভূমিকম্প ও সম্ভাব্য ঝুঁকি
২১ ও ২২ নভেম্বর দুই দিনে দেশে চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার মধ্যে ২১ নভেম্বরের ভূমিকম্প ছিল ৫.৭ মাত্রার। এই কম্পনে ১০ জনের মৃত্যু ঘটে। সাম্প্রতিক কম্পনগুলো মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন ফাটলরেখার সাথে অতীতের কয়েকটি বড় ভূমিকম্প এবং ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন এখনো অব্যাহত আছে।
অতীতের বড় ভূমিকম্পের সঙ্গে সম্পর্ক
এই ফাটলরেখার সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকা বড় ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে অন্যতম ১৮৮৫ সালের ‘বেঙ্গল আর্থকোয়েক’, যা প্রায় ৭ মাত্রার ছিল বলে গবেষকদের ধারণা। এই ভূমিকম্পে শেরপুর, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়।
এ ছাড়া ইউএসজিএসের নথি অনুযায়ী, ১৯২৩ সালে ময়মনসিংহ–কিশোরগঞ্জ এলাকায় ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, যার সঙ্গেও নতুন ফাটলরেখার মিল পাওয়া গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আশরাফুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতায় বহু ফাটলরেখা রয়েছে। গবেষণা এগোলে আরো নতুন ফাটলরেখা চিহ্নিত হতে পারে। তবে ফাটল থাকলেই যে বড় ভূমিকম্প হবে—এ কথা বলা যায় না। একটি ফাটলে কত শক্তি জমা হচ্ছে, তার পুনরাবৃত্তি কত সময়ে ঘটতে পারে—এসব নির্ণয়ের জন্য আরও গভীর গবেষণা প্রয়োজন।’
ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক এ কে এম খোরশেদ আলম বলেন, ‘এই গবেষণায় ব্যবহৃত টেকটোনিক মরফোলজি পদ্ধতি খুবই নির্ভরযোগ্য।’ তিনি আশা করেন, গবেষণার প্রকাশিত সংস্করণে ঝুঁকির অঞ্চলগুলো আরো স্পষ্টভাবে উঠে আসবে।
বাংলাদেশের ভূমিকম্প ইতিহাস
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ১৫৪৮ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলে ৩৩টি বড় ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে ১৮৯৭ সালের ৮.৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ধ্বংস করে দেয়। ১৮৪২, ১৮৪৬, ১৮১২ সালেও বড় ভূমিকম্পে ময়মনসিংহ, পাবনা ও ঢাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।









