ফিলিস্তিনি বৃদ্ধ দম্পতি ফিরে এসেছেন তাদের হাজারো স্মৃতিবিজড়িত বাসস্থানে। কিন্তু সেখানে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। বৃহস্পতিবার ১৬অক্টোবর গাজা সিটির শুজাইয়া পাড়া থেকে তোলা।
সূত্র: আলজাজিরা
ফিলিস্তিনি বৃদ্ধ দম্পতি ফিরে এসেছেন তাদের হাজারো স্মৃতিবিজড়িত বাসস্থানে। কিন্তু সেখানে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। বৃহস্পতিবার গাজা সিটির শুজাইয়া পাড়া থেকে তোলা। আলজাজিরা
গাজা সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, গত শুক্রবার ১০ অক্টোবর দুপুর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরাইলি বাহিনী গাজা উপত্যকায় ৩৬ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় ৭ জন ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন। বুধবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, তাদের মাঠকর্মীরা সাম্প্রতিক কয়েক দিনে গাজার বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলি বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও গুলি চালনার ঘটনা নথিবদ্ধ করেছেন। যদিও তখন যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল।
সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সকালে গাজার পূর্বাঞ্চলের শুজাইয়া এলাকায় ইসরাইলি ড্রোন একটি বেসামরিক নাগরিকদের দলকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, যখন তারা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিজেদের বাড়িঘর পরিদর্শন করছিল। এতে পাঁচজন নিহত হন। কেন্দ্রের ভাষায়, নিহতরা ‘ইসরাইলি বাহিনীর জন্য কোনো হুমকি ছিলেন না।’
একই দিনে গাজার দক্ষিণের খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলীয় আল-ফাখারি শহরে পৃথক এক হামলায় একজন নিহত ও আরেকজন আহত হন। এ ছাড়া জাবালিয়া ও রাফাহ এলাকাতেও ইসরাইলি হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বুধবার সকালেও ইসরাইলি সেনারা গাজার পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলে গুলিবর্ষণ ও গোলাবর্ষণ চালায়। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল যারা যুদ্ধবিরতির সুযোগে নিজেদের ঘরে ফিরতে চেষ্টা করছিলেন। সংস্থাটি জানায়, এই হামলাগুলো অযৌক্তিক এবং কোনো সামরিক প্রয়োজন ছাড়াই চালানো হয়েছে। এগুলো দখলদার বাহিনীর পরিকল্পিত প্রচেষ্টা, যাতে গাজার জনগণের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ ও অনিশ্চয়তা বজায় থাকে। মানবাধিকার সংস্থাটি একই সঙ্গে অভিযোগ করেছে, ইসরাইল এখনও মানবিক সহায়তা প্রবেশে কঠোর সীমাবদ্ধতা বজায় রেখেছে। সাম্প্রতিক দিনে গাজায় প্রবেশের কথা ছিল প্রায় ১ হাজার ৮০০টি ত্রাণবাহী ট্রাকের, কিন্তু ইসরাইল মাত্র ১৭৩টি ট্রাক ঢুকতে দিয়েছে।
এদিকে হামাস জানিয়েছে, বিশেষ সরঞ্জাম ছাড়া তারা আর কোনো নিহত ইসরাইলি জিম্মির মরদেহ ফেরত দিতে পারবে না। এরপরই গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভাঙার হুমকি দেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। গত বুধবার রাতে হামাস আরও দুই ইসরাইলির মরদেহ ফেরত দিয়েছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত মোট ৯ নিহত জিম্মির মরদেহ ইসরাইলের হাতে ফিরেছে। ইসরাইলের দাবি, হামাস যে আরও একটি মরদেহ ফেরত দিয়েছে, তা কোনো ইসরাইলি জিম্মির নয়। ইসরাইলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গাজা থেকে মিসরের রাফা সীমান্ত পারাপারটি বৃহস্পতিবারের পরিবর্তে ‘পরবর্তী কোনো সময়ে’ খোলা হবে। জাতিসংঘ ও মানবিক সংস্থাগুলো এ পথকে গাজায় সাহায্য পৌঁছানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা কোগাতের এক মুখপাত্র জানান, রাফা ক্রসিং দিয়ে ভবিষ্যতেও কোনো মানবিক সহায়তা যেতে দেওয়া হবে না, তবে সীমিত ব্যক্তিগত পারাপার চলবে। ওই মুখপাত্র বলেন, রাফা সীমান্ত দিয়ে কোনো মানবিক সাহায্য পাঠানোর বিষয়ে কখনো কোনো সমঝোতা হয়নি। গাজায় সাহায্য এখনও প্রবেশ করছে অন্য পথ দিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনায় গাজায় ‘সম্পূর্ণ মানবিক সহায়তা’ নিশ্চিত করা ও সব জিম্মিকে জীবিত বা মৃত ফেরত আনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। আঞ্চলিক কূটনীতিকরা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির প্রথম দিকের দিনগুলো ‘উত্তেজনাপূর্ণ’ ও ‘সংবেদনশীল’ হবে। জিম্মিদের মরদেহ ফেরত ও সাহায্য প্রবেশের মতো বিষয়গুলোই প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। ট্রাম্পের পরিকল্পনার অনেক জটিল অংশ নিয়ে এখনও বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।
ইসরাইল ২৮ জন নিহত জিম্মির মরদেহ ফেরত পাওয়ার আশা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, হামাস এখনও বাকি মরদেহগুলো উদ্ধারের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে বিষয়টিতে আস্থা রাখছে না ইসরাইল। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দফতর এক বিবৃতিতে জানায়, যদি হামাস চুক্তির শর্ত না মানে, তা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে ইসরাইল আবার যুদ্ধ শুরু করবে এবং হামাসকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করে গাজার বাস্তবতা পরিবর্তন করবে।
হামাসের ওপর চাপ বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, হামাস যদি চুক্তির শর্ত না মানে, তা হলে তিনি ইসরাইলকে পুনরায় গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করার অনুমতি দিতে পারেন। ট্রাম্প সিএনএনকে ফোনে বলেন, ‘ইসরাইল আমার নির্দেশ পেলে আবার রাস্তায় নামবে। তারা চাইলে এক মুহূর্তেই হামাসকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে।’ কাৎজের হুমকির পর গতকাল বুধবার রাতে এক মার্কিন উপদেষ্টা সাংবাদিকদের জানান, গাজা এখন এমনভাবে ‘ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে’ যে, মরদেহ উদ্ধারে অনেক বাধা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘শুধু চারটি মরদেহ ফেরত আসায় অনেক ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছিল। তবু তারা পরদিনই আরও মরদেহ ফেরত দিয়েছে, যত দ্রুত আমরা তাদের গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছি। আমরা এখন এমন একটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছি, যেখানে মরদেহ উদ্ধারকারীদের পুরস্কৃত করা হবে।’ এদিকে মধ্যস্থতাকারী দেশ তুরস্কের গাজায় মরদেহ উদ্ধারে বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
এ অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হামাস যুদ্ধবিরতির শর্ত না মানলে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে গাজায় পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করার অনুমতি দেবেন তিনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বুধবার ট্রাম্প বলেন, হামাস নিয়ে যা হচ্ছে, সেটি তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে। আমি বললেই ইসরাইলি বাহিনী আবার রাস্তায় নামবে। সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী হামাস জীবিত ও মৃত সব জিম্মিকে ফেরত দেবে। তবে ইসরাইল বলছে, হামাস সেই প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি পালন করছে না। এতে দেশটির ভেতরে ক্ষোভ বাড়ছে।
মার্কিন প্রশাসনের দুই জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা সিএনএনকে জানিয়েছেন, মৃতদেহ উদ্ধারে দেরি হওয়াকে যুক্তরাষ্ট্র এখনও হামাসের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হিসেবে দেখছে না। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হামাস যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে, তারা বাকি দেহগুলো উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেকে চাপা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হামাস যদি নিরস্ত্র না হয় এমন প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ভাবছি। আমি বললেই ইসরাইল আবার রাস্তায় নামবে। তারা চাইলে মুহূর্তেই হামাসকে ধ্বংস করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘আমি ওদের (ইসরাইলি সেনা ও নেতানিয়াহুর সরকার) অনেক কষ্টে থামিয়েছি।
আমার সঙ্গে বিবির (নেতানিয়াহু) এ নিয়ে কঠিন কথাবার্তা হয়েছে।’ তবুও ট্রাম্প দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে আশাবাদী। তার ভাষায়, এই চুক্তির পক্ষে ৫৯টি দেশ আছে। এর আগে এমন কিছু দেখা যায়নি। সবাই এখন আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশ হতে চায়। এখন যেহেতু ইরান আর সমস্যা নয়, সবকিছু এগোচ্ছে।








