জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, শেরপুরের নকলা উপজেলার ধুকুড়িয়া গ্রামের গুম হওয়া মাজহারুল ইসলাম রাসেল’র একমাত্র ছোট বোন দেশ-বিদেশে আলোচিত সেই নুসরাত জাহান লাবনী।
শনিবার (১১ এপ্রিল) রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে কর্মী-সমর্থক ও শুভাকাঙ্খিদের সাথে নিয়ে তিনি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। শেরপুর ও জামালপুর জেলার জনগণের পক্ষে নিজেকে সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরার লক্ষ্যে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন তিনি।
মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ সময় তার সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, শেরপুর ও জামালপুর জেলার বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। পরে নুসরাত জাহান লাবনী বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি তার রাজনৈতিক যাত্রা ও মানবাধিকার আন্দোলনে সফলতা কামনায় দোয়া প্রার্থনা করেন। রিজভী তার সাহসিকতা ও দৃঢ় অবস্থানের প্রশংসা করেন এবং গুম হওয়া পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের দাবিকে সমর্থন জানান।
জানা গেছে, নুসরাত জাহান লাবনী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স এবং মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। লেখাপড়া শেষ করে বেসরকারি একটি ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু করেন। চাকরির পাশাপাশি বিচার বহির্ভূত হত্যা ও গুমসহ সকল অন্যায়ের সুষ্ঠু বিচার দাবিতে ও প্রতিবাদে রাজপথে সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে যুক্ত হন। তিনি গুম হওয়া ভাই মাজহারুল ইসলাম রাসেলের গড়া ‘নকলা উত্তর ছাত্রদল’ নামক সংগঠনের হাল ধরেছেন।
তথ্য মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশব্যাপি বিচার বহির্ভূত হত্যা বা গুম হওয়া পরিবারের ন্যায়বিচারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে সক্রিয় ‘মায়ের ডাক’-এর অন্যতম সদস্য। নুসরাত জাহান লাবনী কর্মজীবী একজন নারী হয়েও দেশ ও দলের স্বার্থে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি শেরপুরের নকলা উপজেলার ধুকুড়িয়া গ্রামের সার-বীজ ব্যবসায়ী মো. আমিনুল ইসলামের তিন সন্তানের মধ্যে একমাত্র মেয়ে ও সবার ছোট সন্তান। লাবনীর বড় ভাই মশিউর রহমান লোটাস ও মাজহারুল ইসলাম রাসেল। রাসেল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর বন্ধু সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ ৬ জনের সঙ্গে সে নিখোঁজ হন। ওই ঘটনার পর থেকেই পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।
লাবনী বলেন, ‘গুম হওয়া প্রতিটি পরিবারের কান্না আমি নিজের পরিবারের মতো অনুভব করি। আমার রাজনীতিতে আসার উদ্দেশ্য ক্ষমতার স্বাদ গ্রহন করা নয়। দীর্ঘদিন দেশে বিচার বহির্ভূত হত্যা ও গুমসহ সকল অন্যায়ের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।’ জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে তিনি কাজ করে যেতে চান। আর তাইতো নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের পাশে থেকে তাদের ব্যথা ও মনের কথা গুলো বলে যাচ্ছেন তিনি। এক্ষেত্রে তিনি কখনো একজন বোনের ভূমিকায়, আবার কখনো মেয়ের ভূমিকা পালন করছেন। হত্যা ও গুমসহ সকল অন্যায়ের সুষ্ঠু বিচার দাবিতে ও প্রতিবাদে তিনি রাজ পথে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। এরজন্য শেরপুর ও জামালপুর জেলাবাসীর সমর্থন, দোয়া ও সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।
গুমের শিকার পরিবারের সদস্য হিসেবে নুসরাত জাহান লাবনীর প্রার্থিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি মানবাধিকার ইস্যুকে সামনে এনে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ।
উল্লেখ্য, মাজহারুল ইসলাম রাসেল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স পরীক্ষায় মেধা তালিকায় তৃতীয় স্থান অর্জনকারী মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি এলাকায় ও বিশ্বদ্যিালয়ে ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তবে জ্ঞান ভিত্তিক রাজনীতি তার পছন্দ ছিল। ২০১৩ সালে মাস্টার্স শেষ করার পর আইন বিভাগে পড়শোনা শুরু করেন। ৩৪তম বিসিএস এ প্রথমবারের মতো পরীক্ষা দিয়েই প্রিলিমিনারী (এমসিকিউ) ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভাইবা পরীক্ষার জন্য প্রস্ততি নিচ্ছিলেন তিনি। তবে দেশ-বিদেশে বিএনপি মনোভাবাপন্নদের সাথে যোগাযোগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে মিছিল-মিটিংয়ে সে সরব ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলো রাসেল। তার একমাত্র ছোট বোন নুসরাত জাহান লাবনীকে সাথে নিয়ে ঢাকার পশ্চিম নাখালপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। ২০১৩ সালের ৪ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রায় এক মাস আগে ভাটারা এলাকার একটি বিল্ডিং এর নিচে থেকে রাত আটটার দিকে রাসেল ও তার চার বন্ধুসহ মোট ছয় জনকে একটি কালো গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিন উঠিয়ে নিয়ে যাওয়াদের মধ্যে কেউ এখন পর্যন্ত ফিরে আসেনি।








