কবি মুশাররাফ করিম (৯ জানুয়ারি, ১৯৪৬ – ১১ জানুয়ারি ২০২০) ছিলেন সত্তর দশকের একজন প্রথিতযশা কবি। তিনি বাংলা কবিতায় লোকজ শব্দ ব্যবহারের জন্য সমধিক পরিচিত। এই কবি একাধারে শিশু সাহিত্যিক এবং ঔপন্যাসিক। জীবিকাসূত্রে তিনি একজন সাংবাদিক ছিলেন। শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ২০০৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।
মুশাররাফ করিমের কবিতায় মানুষ প্রথমে আসে, পরে আসে ভাষা। ভাষা এখানে শোভা নয়— ভাষা প্রয়োজন। যেমন রাতের শেষে দরকার হয় একফোঁটা আলো, ঠিক তেমনই তাঁর কবিতায় শব্দ আসে ক্ষত ঢাকতে নয়, ক্ষতকে চিনিয়ে দিতে।
তিনি উচ্চকণ্ঠ নন। চিৎকার করে কিছু বলেন না। তবু তাঁর কবিতার ভেতর দিয়ে হাঁটলে মনে হয়— কেউ একজন গভীর রাতে দরজায় কড়া নাড়ে, খুলে দেখলে বোঝা যায়, সে আমি নিজেই।
তিনি যখন লিখেন–
“মাতৃগর্ভেই তো ঢের নিরাপত্তা পেয়েছি।
যদিও দশমাস দশদিন দেখা হয়নি সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত;
যদিও অষ্টপ্রহর কেটেছে ঘোর অন্ধকারে
তথাপি পেয়েছি প্রয়োজনীয় খাদ্য
হাত-পা নেড়ে খেলার স্বাধীন সুযোগ।”
এই কবিতাটি বাহ্যত মাতৃগর্ভের স্মৃতি দিয়ে শুরু হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি একটি আত্মজৈবনিক দর্শন। কবি এখানে জন্মকে উদ্যাপন করেন না; বরং জন্মের আগের অবস্থাকে স্মরণ করেন। এই স্মরণই কবিতার আধ্যাত্মিক কেন্দ্র।
এখানে আমরা বুঝে নিই, মাতৃগর্ভ : নিরাপত্তা, অন্ধকার ও আত্মার প্রথম পাঠ। কবি মুশাররাফ করিমের এই কবিতাংশগুলোর আধ্যাত্মিক পাঠে আমরা যা পাই:
“মাতৃগর্ভেই তো ঢের নিরাপত্তা পেয়েছি”—
এই পঙ্ক্তিটি কোনো স্মৃতিচারণ নয়, এটি এক গভীর আত্মস্মরণ। কবি এখানে জীবনের সূচনা নয়, আত্মার প্রথম আশ্রয়ের কথা বলছেন।
মাতৃগর্ভ এই কবিতায় কেবল জৈবিক স্থান নয়। এটি এক পূর্ণাঙ্গ আধ্যাত্মিক প্রতীক— যেখানে আলো নেই, কিন্তু ভয়ও নেই। যেখানে অন্ধকার মানেই অনিশ্চয়তা নয়, বরং নির্ভরতার গাঢ়তা।
“দশমাস দশদিন দেখা হয়নি সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত”—
এই না-দেখা সূর্য এখানে কোনো অভাব নয়। আধ্যাত্মিক পাঠে সূর্য মানে জ্ঞান, বাহ্যিক চেতনা, অহংকারের আলো।
সে আলো না দেখেও আত্মা সেখানে সম্পূর্ণ ছিল, কারণ আত্মার পূর্ণতা বাহ্যিক আলোর ওপর নির্ভরশীল নয়।
“অষ্টপ্রহর কেটেছে ঘোর অন্ধকারে”—
এই অন্ধকার ভয়ংকর নয়। এটি সেই অন্ধকার, যেখানে ঈশ্বরের সান্নিধ্য থাকে নামহীন, নিরাকারভাবে। বহু সাধনায় যেমন চোখ বুজে আলো খোঁজা হয়, তেমনি মাতৃগর্ভের অন্ধকার আত্মার প্রথম ধ্যানকক্ষ।
“তথাপি পেয়েছি প্রয়োজনীয় খাদ্য”—
এখানে খাদ্য শুধু পুষ্টি নয়। এটি অনুগ্রহ। কোনো প্রার্থনা ছাড়াই যা পাওয়া যায়— আধ্যাত্মিক ভাষায় সেটিই করুণা। এই খাদ্য আত্মাকে শেখায়—সব প্রাপ্তির জন্য দাবি করতে হয় না।
“হাত-পা নেড়ে খেলার স্বাধীন সুযোগ”—
এই স্বাধীনতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এটি সেই স্বাধীনতা, যেখানে কোনো নিয়ম নেই, কোনো বিচার নেই, কোনো তুলনা নেই। আত্মা এখানে নিজের মতো থাকে— কোনো পরিচয়ের বোঝা ছাড়াই।
এই কবিতায় কবি এক গভীর প্রশ্ন ছুঁয়ে যান— আমরা কি সত্যিই নিরাপদ ছিলাম বাইরে এসে? নাকি মাতৃগর্ভই ছিল
আমাদের শেষ নির্বিকার স্বর্গ?
আধ্যাত্মিকভাবে দেখলে, মাতৃগর্ভ হলো সেই অবস্থান যেখানে আত্মা এখনো বিভক্ত হয়নি— আমি আর তুমি, জয় আর পরাজয়, পাপ আর পুণ্যের আগে।
এই কবিতাংশ আমাদের মনে করিয়ে দেয়— জীবনের সমস্ত সাধনা, প্রার্থনা, ধ্যান আসলে সেই গর্ভাবস্থার নিরাপত্তা নতুন করে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা। ঈশ্বরকে খোঁজা মানে ফিরে যাওয়া সেই অন্ধকারে— যেখানে ভয় নেই, কিন্তু ভরসা আছে।
এই কবিতা তাই জন্মের কথা বলে না, বলছে প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। যেখানে আলো নেই, তবু সবকিছু ঠিক ছিল।



