ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ চলেছে। ক্রমেই শিক্ষার্থীদের এ বিক্ষোভ জোরালো ও সহিংস হয়ে উঠছে। গাজায় বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভ মার্কিন প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, শিক্ষার্থীরা তাঁবু গেড়ে ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন। রাত-দিন বিভিন্ন সময় যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে মিছিল নিয়ে সড়ক অবরোধ করে রাখছেন। আন্দোলেনের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস বর্জন করেছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অনুষ্ঠানও বয়কট করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলন দমাতে বিক্ষোভকারীদের গ্রেফতার অব্যাহত রেছেছে দেশটির পুলিশ। এরইমধ্যে কয়েকশ শিক্ষার্থী পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে গ্রেফতার, ধ্বস্তাধ্বস্তি, হুমকি, বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমাতে পারছে না মার্কিন প্রশাসন।
সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, নতুন করে শহরের এমারসন কলেজ থেকে স্থানীয় সময় বুধবার রাতে প্রায় ১০৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর আগে সন্ধ্যায় ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয় ৯৩ জনকে।
এদিকে নিউইয়র্কের পর টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অস্টিন শহরে ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসেও বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। সেখান থেকে ৩৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এর আগে কলাম্বিয়া, ইয়েল ও নিউইয়র্ক ইউনির্ভাসিটিতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধ্বস্তাধ্বস্তি হয়। আন্দোলন দমাতে সেখান থেকে গণগ্রেফতারের ঘটনা ঘটে। কিন্তু এতে ওই বিশ্ববিদ্যালয় তিনটির শিক্ষার্থীরা ভীত না হয়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে রাতারাতি বিক্ষোভ শুরু হয়।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষার্থীরা গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন। প্রথমে কলম্বিয়া ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল হয়ে ওঠে। সেখানে হস্তক্ষেপ করে পুলিশ।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসজুড়ে দেখা যায় ফিলিস্তিনের পতাকা। বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে শতাধিক বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।বিশ্ববিদ্যালয়ে বাতিল হয় সশরীরে ক্লাস। এর পরপরই এ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে।
এছাড়া ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেশ কয়েকজন ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়। এ খবর দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসেন।
এর মধ্যে সোমবার (২২ এপ্রিল) রাতে পুলিশ নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ দমাতে যায়। সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ধ্বস্তাধ্বস্তি হয়। এ সময় বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
এতে উত্তেজনা আরও বাড়ে। বার্কলে, এমআইটিসহ যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া–বার্কলে ও ইউনির্ভাসিটি অব মিশিগানেও ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ চলছে। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ইসরায়েলপন্থি ও ইহুদি গোষ্ঠী বলছে, এসব বিক্ষোভে ইহুদিবিরোধী উপাদান রয়েছে। ফলে তারা নিরাপদ বোধ করছেন না।
নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির কয়েকজন ইহুদি শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ‘হুমকিপূর্ণ’ উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন, সেখানে ইহুদি শিক্ষার্থীদের ওপর হয়রানির ঘটনা খুবই বিরল।
এদিকে টেক্সাস ইউনিভার্সিটিতে বিক্ষোভকারীদের সরাতে বুধবার অভিযানে নামেন পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা। লাঠি হাতে ঘোড়ায় চড়ে পুলিশ সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। টেক্সাসের গভর্নর বলেছেন, এই বিক্ষোভকারীদের ‘কারাগারে থাকা উচিত’।
বৃহস্পতিবার সকালের দিকে মিনিসোটার ডেমোক্র্যাট দলীয় কংগ্রেসউইমেন ইলহান ওমর ক্যাম্পাস পরিদর্শন করেন। গত সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাকি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিক্ষোভে যোগ দেওয়া ইলহান ওমরের মেয়ে ইসরা হিরসিকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয় স্থানীয় পুলিশ।
ইলহান ওমর বলেন, মাত্র ৭০ জন শিক্ষার্থীর মাধ্যমে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। সেদিন থেকেই গাজায় নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা এ হামলায় উপত্যকাটিতে ৩৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে তীব্র মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে সেখানে।














